Category Archives: Blog

  • দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান শস্যে পরিণত হয়েছে বোরো ধান। মোট উৎপাদিত চালের অর্ধেকই জোগান দেয় বোরো। বোরোতে এই সাফল্যই বিশ্বে তৃতীয় শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী দেশের অবস্থান এনে দিয়েছে বাংলাদেশকে। অথচ সেই বোরো চাষেই আয়ের দিক থেকে কৃষকের অর্জন শূন্য। লাভ দূরে থাক, উল্টো নিয়মিত গুনতে হচ্ছে লোকসান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোরো ধানে কৃষকের লোকসানের অন্যতম কারণ এতে উৎপাদন খরচ বেশি। আউশ-আমনে সেচ খরচের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বোরোতে সেচের পেছনে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয় কৃষককে। খরচ বেশি হলেও সে তুলনায় ধানের দাম পান না কৃষক। ফলে গুনতে হয় লোকসান। কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে গত বোরো মৌসুমে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৪০ টাকায় কেনার ঘোষণা দিয়েছিল খাদ্য অধিদপ্তর। কিন্তু ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে গড়িমসির কারণে সরকার ঘোষিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করতে হয়েছে কৃষককে। হাওড়ের সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদনকারী জেলা সুনামগঞ্জের কৃষকরা জানান, অঞ্চলভেদে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে ৭০০-৮৫০ টাকা খরচ হলেও ওই ধান বিক্রি করতে হয়েছে মাত্র ৬০০-৭৫০ টাকায়। এতে উৎপাদন খরচ তো ওঠেইনি উল্টো গুনতে হয়েছে লোকসান। শুধু সুনামগঞ্জ নয়, একই চিত্র ছিল দেশের প্রায় সব জায়গায়। এদিকে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, প্রতি হেক্টর বোরো আবাদে কৃষকের এখন ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৬ হাজার ৩৫ টাকা। তবে আউশ ও আমনে লাভের মুখ দেখছে কৃষক। প্রতি হেক্টর আউশ আবাদে কৃষকের মুনাফা হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার ৭১০ টাকা। অন্যদিকে আমন ধানে মুনাফা হচ্ছে ৯ হাজার ৬৯০ টাকা। ‘প্রমোটিং এগ্রি ফুড সেক্টর ট্রান্সফরমিং ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদন তৈরিতে সারজেন্ট অ্যান্ড গ্রাফহামের ‘বিল্ডিং রেজিল্যান্স অ্যান্ড কম্পিটেটিভনেস এলং ভ্যালু-চেইনস ইন এগ্রি ফুড সিস্টেম’ শীর্ষক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যে গবেষণাটি মূলত বিশ্বব্যাংকের ‘এগ্রিকালচার স্ট্র্যাটেজিস ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ফুড প্র্যাকটিস’ শীর্ষক গবেষণার ব্যাকগ্রাউন্ড পেপার হিসেবে ছিল। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, প্রতি হেক্টর বোরো আবাদে কৃষকের গড় ফলন ধরা হয়েছে প্রায় চার হাজার কেজি। প্রতি কেজি ধানের দাম ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ টাকা। ফলে প্রতি হেক্টর বোরো আবাদে কৃষকের মোট আয় হয় ৫৬ হাজার ১৫ টাকা। এর বিপরীতে কৃষকের খরচ হচ্ছে প্রায় ৬২ হাজার ৫০ টাকা। এসব খরচের মধ্যে বীজে ৩ হাজার ৪৮৫ টাকা, সারে ৭ হাজার ৫৬৫ টাকা, কীটনাশক ও বালাইনাশকে ৩ হাজার ৯৯৫ টাকা, কৃষিযন্ত্র বাবদ ৮ হাজার ১৬০ টাকা, সেচে ১০ হাজার ৩০ টাকা, ভাড়া করা শ্রমের খরচ ২৩ হাজার ৯৭০ টাকা এবং নিজেদের পরিবারের শ্রম খরচ ৪ হাজার ৭৬০ টাকা ধরা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, নিজেদের পরিবারের শ্রম খরচ বাদ দিলে কৃষকের আয় ও ব্যয় অনেকটাই সমান সমান। কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে বলে বৈশ্বিক বিভিন্ন সংস্থা শঙ্কা প্রকাশ করলেও বাংলাদেশের দানাদার খাদ্যশস্য বিশেষ করে চালের উদ্বৃত্ত উৎপাদন হবে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। সংস্থাটি এও বলেছে, চলতি বছরে প্রথমবারের মতো চাল উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়াকে টপকে তৃতীয় স্থানে চলে আসবে বাংলাদেশ। দেশের এ অর্জনে বড় অবদান রাখবে শুধুই বোরো আবাদ। যে বোরো দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সুনাম অর্জন ও বৃদ্ধিতে বিশেষ অবদান রাখছে, সেই ধান আবাদে কৃষক লোকসান গুনছে কেন? মুনাফা না হলেও কেনই বা তারা বোরো আবাদ করছে? এসব প্রশ্নের জবাবে সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, বোরোতে সেচের খরচ এবং শ্রমিক খরচ অত্যধিক বেশি হওয়ার কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি অন্যান্য খরচ বৃদ্ধি তো আছেই। মূলত তিনটি কারণে বোরো ধান থেকে কৃষক সরতে পারছে না।  প্রথম কারণটি হচ্ছে, নিজের নিত্য চালের চাহিদা মেটাতে ধান উৎপাদন ধরে রাখতে চায় কৃষক। এই শস্য আবাদ করলে স্বল্প সময়ে বাড়তি চাল উৎপাদন করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, ধান বিক্রি করে নিশ্চিত নগদ অর্থ ঘরে আসে। কেজিপ্রতি ধানের দাম কিন্তু খুব বেশি পার্থক্য হয় না। তৃতীয় কারণটি হলো বেশির ভাগ কৃষকের দ্বিতীয় কোনো অপশন নেই। বিশেষ করে হাওড় অঞ্চলের কৃষকরা মূলত একটি ধান করতে পারে। তিনি বলেন, ধানের দাম না বাড়িয়ে ভোক্তা সন্তুষ্ট রাখতে হলে সেচে ভর্তুকি বাড়ানো এবং যান্ত্রিকীকরণ বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে হবে। কৃষিকে লাভজনক না করতে পারলে কৃষকের পরবর্তী প্রজন্ম কৃষিতে থাকতে চাইবে না। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে গত অর্থবছরে প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বোরো আবাদ হয় ৪৮-৪৯ লাখ হেক্টরে, যা মোট ধান আবাদের প্রায় ৪২ শতাংশ। অন্যদিকে আমনের আবাদ হচ্ছে ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে এবং আউশের আবাদ হয় ১১-১২ লাখ হেক্টরে। অন্যদিকে গত অর্থবছরে ৩ কোটি ৮৮ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বোরোতে ২ কোটি ৪ লাখ টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এরই মধ্যে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার পথে রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কিছুটা ক্ষতি হলেও লক্ষ্যমাত্রা থেকে বিচ্যুতির আশঙ্কা কম। ফলে বোরো আবাদের মাধ্যমে মোট চালের চাহিদা পূরণ হবে প্রায় ৫০ শতাংশ। বোরোতে কৃষকের আয় না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা জেনেছি আউশ, আমন ও বোরো এ তিনটি ধানের মধ্যে কৃষককে সবচেয়ে কম মুনাফা দিচ্ছে বোরো ধান। তবে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটি এখনো আমরা পাইনি। বোরোতে মুনাফা কম দিচ্ছে এমন বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে ধানের আবাদকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। বোরো আবাদ থেকে সরে আউশ ও আমনে জোর দিতে প্রণোদনাসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। আবার আমন ও বোরোর মাঝখানে একটি স্বল্পমেয়াদি বাড়তি শস্য আবাদ করতে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। বোরোর পরিবর্তে রবি মৌসুমে অন্যান্য অর্থকরী ফসল ও আমদানিনির্ভর শস্য আবাদে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করতে অর্থায়ন ও উপকরণ সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। এটির ফলও আমরা এরই মধ্যে পেয়েছি। তবে সেটি ধীরে হলেও সামনের দিনে তা আরো গতি পাবে। গতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত চালের উৎপাদন ঠিক রাখতে আমরা বোরো আবাদে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোয় নজর দিচ্ছি। বিশেষ করে সেচ ও বীজের দাম কমানো হয়েছে। পাশাপাশি সারের দামও কমানো হয়েছে। এছাড়া যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষকের শ্রম খরচ কমানো হচ্ছে। কৃষিতে নতুন মডেল সিনক্রোনাইজড আবাদ পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে সার্বিক উৎপাদন খরচ অনেক কমিয়ে আনতে পারব।

  • এক দুধকালে একটি গাভী গড়ে আড়াই হাজার কেজি দুধ দেয়। এটি বৈশ্বিক গড়। কিন্তু বাংলাদেশে একটি গাভী দুধ দেয় গড়ে ২০৫ কেজি। একই অবস্থা মাংসের উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রেও। সারা বিশ্বে যেখানে প্রতিটি গরু থেকে গড়ে ২২০ কেজি মাংস উৎপাদন হয়, সেখানে বাংলাদেশে পাওয়া যায় ৭২ কেজিরও কম। শুধু দুধ বা মাংস উৎপাদন নয়, প্রাণিসম্পদ খাতের প্রায় সব ক্ষেত্রেই উৎপাদনশীলতায় বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে উন্নত দেশ তো বটেই, এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়েও উৎপাদনশীলতা কম বাংলাদেশের। বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নত জাত না আসায় গাভীর দুধ উৎপাদন সক্ষমতা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। একই কারণে পিছিয়ে দুধ-মাংসের উৎপাদনশীলতাও। শুধু ভালো জাত না থাকার কারণে বেশি পরিমাণে খাদ্য দিয়েও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ দুধ ও মাংস পাওয়া যাচ্ছে না। উন্নত বিশ্বে যেখানে সাড়ে তিন থেকে চার কেজি খাদ্য দিলে এক কেজি মাংস উৎপাদন করতে সক্ষম, সেখানে বাংলাদেশের গরুকে দিতে হয় সাত থেকে সাড়ে আট কেজি খাদ্য। এতে খরচ বাড়লেও সে অনুযায়ী লাভবান হতে পারছেন না খামারিরা। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএলআরআই) সাবেক মহাপরিচালক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, সারা বিশ্বে প্রাণিসম্পদ খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার যে হারে এগিয়েছে তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি বাংলাদেশ। আমাদের কৃষক ও খামারিরা প্রযুক্তি বাস্তবায়নে পরিপূর্ণ দক্ষ না হলেও প্রযুক্তি গ্রহণে খুব আগ্রহী। কিন্তু আমরা সেই প্রযুক্তি দিতে পারছি না। বিশেষ করে পশুর জাত উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে গেছি। এখনো প্রাচীন একটি ব্রিড নিয়েই গরু মোটাতাজা করে যাচ্ছি। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও খাদ্যের মানে রয়েছে অনেক ঘাটতি। পশুগুলো এখনো পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে না। আবার একজন পশু চিকিৎসক বা ডাক্তারকে কয়েক লাখ পশু-প্রাণীকে সেবা দিতে হয়। ফলে সেবার মানে থেকে যাচ্ছে ঘাটতি। ফলে উন্নত ব্রিড না থাকা, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবার মানে পিছিয়ে থাকার কারণেই প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি। প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতায় বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদনেও। এফএওস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিটি গরু থেকে গড় মাংস উৎপাদন হচ্ছে ৭১ দশমিক ২০ কেজি, যেখানে বৈশ্বিক গড় ২১৯ দশমিক ৩৬ কেজি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানে ১৯৬ কেজি, শ্রীলংকায় ১৩৭ কেজি এবং ভারতে ১০৩ কেজি মাংস উৎপাদন হয় প্রতিটি গরু থেকে। দেশে প্রতিটি ছাগল থেকে গড়ে সাত কেজি করে মাংস পাওয়া গেলেও এক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড় ১২ দশমিক ৩২০ কেজি। যদিও আফগানিস্তানে একটি ছাগল থেকে গড়ে ১৩ কেজি, শ্রীলংকায় ২০ কেজি এবং পাকিস্তানে ১৭ দশমিক ১৮ কেজি মাংস পাওয়া যায়। অন্যদিকে দেশে প্রতিটি মুরগির মাংস দিচ্ছে গড়ে এক কেজির নিচে বা প্রায় ৭০০ গ্রাম, যেখানে বৈশ্বিক গড় ১ কেজি ৬৪০ গ্রাম। আবার প্রতিটি হাঁস থেকে মাংস পাওয়ার বৈশ্বিক গড় ১ কেজি ৪৯০ গ্রাম হলেও বাংলাদেশে পাওয়া যায় প্রায় এক কেজি। ডিমের ক্ষেত্রেও অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে প্রতিটি মুরগি গড়ে ২ দশমিক ১৯ কেজি ডিম দেয়। যদিও এক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড় ১০ দশমিক ৪ কেজি। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারতে একটি মুরগি থেকে প্রায় ১৩ কেজি এবং শ্রীলংকায় ১২ দশমিক ২২ কেজি ডিম পাওয়া যায়। এ বিষয়ে এসিআই অ্যানিমেল হেলথের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ফা হ আনসারী বলেন, মাংস ও দুধের উৎপাদনশীলতার সঙ্গে খামারিদের খরচ কমানোর একটি সম্পর্ক রয়েছে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানো গেলে কম খরচে ভোক্তাকে দুধ ও মাংস সরবরাহ সম্ভব হবে। তখন খামারিরাও লাভবান হতে পারবেন। কিন্তু গরুর জাত উদ্ভাবনে দেশে ৩৫ বছরের আগের সেই ব্রিড নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। অনেক পশুই এখন ইনব্রিড শুরু হয়ে গেছে। আর এ কারণেই মাংস বা দুধ উৎপাদনক্ষমতা কমে গেছে। অথচ উন্নত বিশ্বে জাত উদ্ভাবনে প্রতিনিয়তই গবেষণা এবং নতুন নতুন সিমেন দিচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি অ্যামব্রায়ো সম্প্রসারণ করছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। আবার দুধ ও মাংস বিপণনের ক্ষেত্রে খামারিদের নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না। খাদ্য সরবরাহে যেমন সংকট রয়েছে, তেমনি খামারি পর্যায়ে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিও রয়েছে। ফলে খামারিদের আরো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। দুধ: গরুর দুধের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এখানে প্রতিটি গরু গড়ে ২০৫ দশমিক ৩২ কেজি দুধ দিচ্ছে। যদিও এক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড় ২ হাজার ৪৪৯ দশমিক ১২ কেজি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতে প্রতিটি গরু গড়ে ১ হাজার ৫৮৮ কেজি, পাকিস্তানে ১ হাজার ২৩০ কেজি, ভুটানে ১ হাজার ৩৮৬ কেজি এবং শ্রীলংকায় প্রায় ৯৭৮ কেজি দুধ দিচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রতিটি ছাগল দুধ দিচ্ছে ৩৮ দশমিক ২৮ কেজি। যদিও বৈশ্বিক গড় ৮৬ দশমিক ৭০ কেজি। ভারতের ছাগল দিচ্ছে প্রায় ১৬৭ কেজি দুধ। বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) কেন্দ্রীয় মহাসচিব মো. শাহ এমরান বণিক বার্তাকে বলেন, ভারতের একজন খামারি প্রতিটি গাভী থেকে ২০ কেজির বেশি দুধ পাচ্ছেন। আর আমরা পাচ্ছি মাত্র ছয়-আট কেজি। আবার ওরা উৎপাদনে কম খরচ করলেও আমাদের দ্বিগুণের বেশি খরচ করতে হচ্ছে। ফলে খামারিরা কোনোভাবেই দুগ্ধ শিল্পে লাভবান হতে পারছেন না। এর পেছনে সরকারের নীতিসহায়তার ভীষণ দুর্বলতা রয়েছে। দেশে দুধের উৎপাদন বাড়তির দিকে থাকলেও আমদানিকে অবারিত করে রাখা হয়েছে। ফলে খামারিরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। আবার উন্নত গাভীর জন্য সিমেন আমদানি বা অ্যামব্রয়ো পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করা হচ্ছে না। অন্যদিকে খামারিদের এখনো বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল ও জমির খাজনা দিতে হচ্ছে বাণিজ্যিক রেটে। ফলে তারা উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়াতে পারছেন না, তেমনি খরচও কমাতে পারছেন না। উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণনসহ প্রক্রিয়াকরণের প্রতিটি পর্যায়ে এখনো পদক্ষেপ না নিলে দেশের দুগ্ধ খাত আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ৪০ কোটি ২৫ লাখ ৬৩ হাজার গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি উৎপাদন হয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩৯ কোটি ৩১ লাখ ৩১ হাজার। উৎপাদনশীলতা ভালো না থাকার কারণে প্রাণিসম্পদের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি খুব বেশি জোরালো হচ্ছে না। দেশের খামারিরা প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি ৬৮ লাখ পিস ডিম উৎপাদন করছেন। ডিমের মোট উৎপাদনে ভালো উল্লম্ফন থাকলেও এখানেও ঘাটতি রয়েছে উৎপাদনশীলতায়। চাহিদার সমান মাংসের উৎপাদন হলেও দুধের ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৫৩ লাখ টন। ঘাটতির কারণে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ হাজার ৮২১ কোটি টাকার দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি হয়েছে।

  • দুই দশক আগেও গ্রামীণ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস ছিল শস্য খাত। সে সময় মোট গ্রামীণ আয়ে শস্য খাতের অবদান ছিল প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এর পরেই অবস্থান ছিল ছোটখাটো ব্যবসা বা ক্ষুদ্র উদ্যোগের। একই সঙ্গে বড় হতে থাকে অকৃষিজ সেবা ও রেমিট্যান্স খাতের অবদানও। ফলে বর্তমানে এসে দেখা যাচ্ছে, গ্রামীণ পরিবারের আয়ে শস্য খাতের অবদান নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ পরিবারগুলোয় এখন শস্যনির্ভর কর্মসংস্থান অনেক কম হচ্ছে। এর বিপরীতে বেড়েছে কৃষিজ ও অকৃষিজ কর্মসংস্থান। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসা, যান্ত্রিকীকরণ, বিপণনসংশ্লিষ্ট নানা কার্যক্রমের অবদান এখন বেড়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে মত্স্য, প্রাণী ও বনায়নের মতো শস্যবহির্ভূত উপখাতও। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে কৃষি খাতে মোট কর্মসংস্থানের হার ৪০ শতাংশ। ২০০০ সালেও দেশের গ্রামীণ পরিবারগুলোর আয়ে শস্য খাতের অবদান ছিল ২৫ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তা নেমে এসেছে ১২ শতাংশে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, কিছু যৌক্তিক কারণেই গ্রামীণ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানে শস্য খাত পিছিয়ে পড়েছে। একটি রূপান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অন্য খাতগুলো এগিয়ে আসছে। তবে শস্য খাত মূলত আবহাওয়ানির্ভর হওয়ার কারণে সবসময়ই ঝুঁকিতে থাকে। এছাড়া ফসলের মূল্যের ওঠানামাটাও হয় অনেক বেশি। ফলে কৃষকদের উৎপাদন ও বিপণনসংশ্লিষ্ট নানা ঝুঁকি নিয়ে এ খাতে নিয়োজিত থাকতে হয়। খাদ্য ও আয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদেই তাদের একপর্যায়ে এসে অকৃষিজ কর্মকাণ্ডে ঝুঁকতে হয়। গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও আয়ে শস্য খাতের অবদান ধরে রাখতে হলে অবশ্যই আবহাওয়া নির্ভরতা কমাতে হবে জানিয়ে কৃষি অর্থনীতি সমিতির সাবেক এ সভাপতি বলেন, মাটির সংস্পর্শ ছাড়াই কৃষি খাতকে এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা ও নীতি গ্রহণ করতে হবে। ক্ষুদ্র জমিকে বৃহদায়তন করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের জন্য কারিগরি প্রযুক্তির রূপান্তর ও যান্ত্রিকীকরণকে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। শস্য খাতে প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক কৃষির প্রয়োগই সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারে। গ্রামীণ মানুষের আয়ে অকৃষিজ খাতের অবদান এখন দিন দিন বাড়ছে। বিবিএসের সম্প্রতি প্রকাশিত ‘রিপোর্ট অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল স্ট্যাটিসটিকস ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের গ্রামীণ পরিবারগুলোর বার্ষিক আয় এখন প্রায় ২ লাখ ২ হাজার ৭২৪ টাকা বা মাসে প্রায় ১৬ হাজার ৮৯৩ টাকা। এর মধ্যে কৃষি এরপর ্ব পৃষ্ঠা ২ কলাম ১ খাত থেকে আসে ৩৮ দশমিক ২১ শতাংশ। বাকি প্রায় ৬১ দশমিক ৭৯ শতাংশ আসে অকৃষি খাত থেকে। বিভাগ অনুসারে কৃষি খাত থেকে আয় সবচেয়ে কম হয় ঢাকা ও সিলেট বিভাগে। এ দুটি বিভাগের বাসিন্দাদের আয়ে কৃষি খাতের অবদান যথাক্রমে ২৮ দশমিক ৮ ও ৩০ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কেএএস মুরশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, গ্রামীণ আয় ও কর্মসংস্থানের এ ধরনের পরিবর্তন দুটো বিষয়ের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একটি হলো কৃষিতে বহুমুখীকরণ হয়েছে কিন্তু শস্য খাতে এখনো কাঙ্ক্ষিত বহুমুখীকরণ হয়নি। দ্বিতীয়টি হলো শস্য খাতে এখনো বোরো ধানকেন্দ্রিক বিনিয়োগ হচ্ছে, যেটি কিনা খুব বেশি মুনাফা দিতে পারছে না। কৃষি খাতে রূপান্তর প্রক্রিয়া দ্রুত আনতে না পারলে এ খাতের ক্রমহ্রাসমান প্রবৃদ্ধির চিত্র আরো খারাপের দিকে যেতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রথাগত কৃষি থেকে আধুনিক কৃষিতে যেতে হবে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি সক্ষম করে তুলতে হবে শস্য খাতকে। এজন্য বাড়তি বিনিয়োগ ও আর্থিক প্যাকেজ সঠিকভাবে দিতে হবে। পাশাপাশি মূল্য সংযোজন ও তারুণ্যনির্ভর কৃষিতে গুরুত্বারোপ করতে হবে। শস্য খাতে এখন মোটামুটিভাবে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন খুব প্রয়োজন। এছাড়া সার্বিক কৃষি খাতেও মানহীনতা রয়েছে কর্মসংস্থানের। কৃষিতে বর্তমানে মোট কর্মসংস্থান প্রায় আড়াই কোটি। এর ৩৫ দশমিক ৯০ শতাংশই কাজ করছে পারিবারিক সহায়তাকারী হিসেবে। আত্মকর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৩৩ দশমিক ৫২ শতাংশের। কৃষি শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এ বিষয়ে এসিআই এগ্রি বিজনেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ফা হ আনসারী বলেন, শস্য খাতের সমসাময়িক প্রতিবন্ধকতাগুলোকে অনুধাবন করতে হবে এবং সে অনুসারে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। শস্য বহুমুখীকরণ ও উৎপাদনশীলতায় আমরা এখন অনেকটাই পিছিয়ে। প্রযুক্তি ও যন্ত্রের ব্যবহার ছাড়া বিকল্প টেকসই কোনো উপায় নেই। এছাড়া প্রতিকূল পরিবেশের উপযোগী প্রযুক্তি ও উৎপাদন কৌশল, হাইব্রিড শস্যের প্রসার, পানিসাশ্রয়ী সেচ পদ্ধতি, সার ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি প্রযোজন। এতে কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষকের আয়ও বৃদ্ধি পাবে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি রোধে ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় নতুন জাত, ভূমি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। জমির উর্বরতাশক্তি ধরে রাখা এবং ফসলের বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।

  • খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানি বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে প্রতি বছর। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, তুলা বাদে অন্যসব খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানিতে প্রতি বছর ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এর সঙ্গে তুলা আমদানিতে ব্যয়কৃত অর্থ যোগ করলে খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের বার্ষিক ব্যয় দাঁড়ায় ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রতি বছর শুধু খাদ্যশস্য আমদানিতেই বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয় বাংলাদেশকে। ভোজ্যতেল, তেলবীজ, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, ডালবীজ, ফল ও মসলাপণ্যের ক্ষেত্রেও এখনো ব্যাপক মাত্রায় আমদানিনির্ভর রয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ। যদিও সঠিক পরিকল্পনাভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব পণ্যের আমদানিনির্ভরতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এফএওর বার্ষিক পরিসংখ্যানে উপস্থাপিত ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশে আমদানীকৃত কৃষি ও খাদ্যপণ্যের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক বলছে, এ সময়ে বার্ষিক গড়ে ৭২০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। চলতি বিনিময় হারের ভিত্তিতে রূপান্তরের পর বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশিতে। বিশ্বব্যাংকের উপস্থাপিত এ পরিসংখ্যানের বাইরে তুলা আমদানিকে আমলে নেয়া হলে দেশে খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানিতে ব্যয় ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও তুলা আমদানিতে সাড়ে ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যানে উপস্থাপিত তথ্য বলছে, তুলার বাইরে অন্যান্য কৃষি ও খাদ্যপণ্যের মোট আমদানি ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি খরচ হচ্ছে চারটি পণ্য আমদানিতে। এর মধ্যে ভোজ্যতেলেই ব্যয় হচ্ছে ২৬ শতাংশ (পাম অয়েলে ১৬ এবং সয়াবিন ও অন্যান্য ভোজ্যতেল ১০ শতাংশ)। এছাড়া গম ও চিনি আমদানিতে খরচ হচ্ছে মোট আমদানি ব্যয়ের যথাক্রমে ১৪ ও ১১ শতাংশ। এছাড়া মোট ব্যয়ের ৬ শতাংশ শুকনা সবজি আমদানিতে, ৬ শতাংশ চালে ও ৬ শতাংশ সয়াবিন বীজ আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে। পাশাপাশি দুধ ও ক্রিম আমদানিতে ৪ শতাংশ, ভুট্টায় ৩ ও পশুখাদ্যে ৩ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে। এর বাইরেও অয়েল কেক, আপেল ও অন্যান্য ফল, পেঁয়াজ এবং অন্যান্য মসলার প্রতিটিতে ব্যয় হচ্ছে ২ শতাংশ করে। ১ শতাংশ করে ব্যয় হচ্ছে সাতটি পণ্য আমদানিতে। এগুলো হলো সিট্রাসজাতীয় ফল, আটা, ময়দা ও অন্যান্য পণ্য, আদা, জাফরান, হলুদ, ছোলা ও মত্স্যজাত পণ্য। খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক হারে আমদানিনির্ভরতা প্রসঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ পুলের সদস্য এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সাবেক মহাপরিচালক হামিদুর রহমান মনে করছেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে সক্ষম থাকলেও সে সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি বাংলাদেশে। এর ফলে আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও বেড়েছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দানাদার খাদ্যশস্য ছাড়াও অন্যান্য শস্যের উৎপাদন বাড়িয়ে শস্যের বহুমুখীকরণ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিচ্ছে। কয়েক বছর ধরেই চালে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি উদ্বৃত্ত উৎপাদনও হচ্ছে। সে অর্জনকে সামনে নিয়ে দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উদ্যোগী হয়েছে সরকার। কৃষি মন্ত্রণালয় বর্তমানে তেল ও ডালজাতীয় শস্যের আবাদ বৃদ্ধিতে কাজ করছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, এজন্য বোরো ও আমন মৌসুমে আরো উচ্চফলনশীল জাতের ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে সময়কাল কমিয়ে আনা হচ্ছে। এতে কয়েক লাখ হেক্টর জমি বেরিয়ে আসবে। তখন এসব জমিতে তেল ও ডালজাতীয় শস্য আবাদ করা সম্ভব হবে। আবহাওয়াগত বিষয় থাকায় গম উৎপাদন সে হারে না বাড়লেও উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগানো হচ্ছে। মসলাজাতীয় শস্যের আবাদ এলাকা এরই মধ্যে বাড়ানো হয়েছে। সেজন্য স্বল্প সুদে কৃষককে ঋণ দেয়ার পাশাপাশি উদ্ভাবিত বিভিন্ন নতুন জাত কৃষকদের মধ্যে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। সম্প্রসারণকর্মীরা মাঠ পর্যায়ে আমদানিনির্ভর ফসল আবাদে কৃষকদের উৎসাহ ও পরামর্শ দিচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১২ লাখ টন গম উৎপাদনের বিপরীতে আমদানি হয়েছে প্রায় ৫৭ লাখ টন। উৎপাদনে একধরনের স্থবিরতা থাকায় গম আমদানিতে ব্যয় ছাড়িয়েছে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। একই অবস্থা ভোজ্যতেল ও তেলবীজেও। এ দুই ধরনের পণ্যের চাহিদার সিংহভাগই পূরণ করতে হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে। এসব পণ্য আমদানিতে প্রতি বছর বেরিয়ে যাচ্ছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে দেশে ডালশস্যের চাহিদার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ পূরণ হচ্ছে স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে। এ চাহিদা প্রতিনিয়ত বেড়ে চললেও ডালশস্যের পণ্যের আবাদ কমছে ধারাবাহিকভাবে। ফলে গত ১০ অর্থবছরে ডালজাতীয় পণ্যের আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে গত কয়েক বছরে দেশে দুধের উৎপাদন দ্বিগুণ বেড়ে ৯৯ লাখ টনে উন্নীত হলেও পূরণ হচ্ছে না চাহিদা। এর পরও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ টন। ফলে এক্ষেত্রেও একধরনের আমদানিনির্ভরতা থেকেই যাচ্ছে। যদিও সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে দেশে উৎপাদনের মাধ্যমেই দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ডেইরি ডেভেলপমেন্ট ফোরামের (বিডিডিএফ) সভাপতি অ্যাডভোকেট উম্মে কুলসুম স্মৃতি এমপি বণিক বার্তাকে বলেন, আগামী দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব। এজন্য শুধু তিনটি কাজ করতে হবে। প্রথমত গুঁড়া দুধ আমদানি, বিশেষ করে বাল্ক ফিল্ড মিল্ক আমদানিতে শুল্কহার বাড়াতে হবে। দেশেই গুঁড়া দুধের প্ল্যান্ট তৈরিতে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। দ্বিতীয়ত এ শিল্পের বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল, জমির খাজনাকে বাণিজ্যিকের আওতা থেকে কৃষি খাতের আওতায় আনতে হবে এবং খামারিদের দুধ সংগ্রহ ও বাজারজাতের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার জন্য ২০ বছর আয়কর রেয়াত সুবিধার পাশাপাশি ভালো জাত উন্নয়ন, পশুখাদ্য ও চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে। বর্তমান সরকার এসব বিষয় বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে।

  • দেশের বেসরকারি পাটকলগুলো মুনাফায় থাকলেও ক্রমাগত লোকসানেই চলেছে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন সরকারি পাটকলগুলো। সর্বশেষ ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও বিজেএমসির অধীন পাটকলগুলো লোকসান দিয়েছে প্রায় ৫৭৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু শ্রমিক আন্দোলন থামাতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৬ কোটি টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র তিনবার মুনাফার দেখা পেয়েছে বিজেএমসি। এর মধ্যে সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল সংস্থাটি। এর পর থেকে প্রতি বছর ক্রমাগত লোকসানেই রয়েছে সংস্থাটি। এ বিপুল পরিমাণ ক্ষতির জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর অব্যবস্থাপনা ও পরিচালনাগত অদক্ষতাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আয়, ব্যয় ও লোকসানের পরিসংখ্যান (প্রভিশনাল) এবং লোকসানের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিজেএমসি দেখিয়েছে, এ সময় বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক আন্দোলন থামানো ও গেট মিটিং পরিচালনায় সংস্থাটির ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যা মোট লোকসানের প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ। এছাড়া সিবিএ কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা মোট লোকসানের দশমিক ৫৫ শতাংশ। গত দুই বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন বা কারখানাগুলোর আধুনিকায়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া শ্রমিকদের জন্য কোনো বরাদ্দ বা সহযোগিতার কোনো অর্থও দেয়া হয়নি বলে দাবি তাদের। একই সঙ্গে আন্দোলন থামাতে শ্রমিকদের কোনো অর্থ দেয়া হয়নি বলেও জানিয়েছেন তারা। এ বিষয়ে খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিলের প্রকল্প প্রধান কামরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, শ্রমিক আন্দোলন থামাতে শ্রমিকদের অর্থ প্রদানের প্রশ্নই ওঠে না। আমরা গত কয়েক বছরে শুধু কারখানার নিয়মিত পরিচালনা ঠিক রাখার জন্য কিছু যন্ত্রাংশ মেরামত করেছি। কিন্তু নতুন কোনো যন্ত্র বসানো হয়নি। আধুনিকায়ন কিংবা এ ধরনের কোনো বিনিয়োগ এ কারখানায় হয়নি। এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বণিক বার্তাকে বলেন, এ ধরনের ব্যয় করার আইনি বৈধতা আছে কিনা, বা থাকলেও কী ধরনের ব্যয়ের স্বাধীনতা আছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ব্যয়কে বিভিন্ন নামে চালিয়ে দেয়ার যে প্রবণতা, সেটি এ ধরনের তথ্যের মাধ্যমে উঠে এসেছে। শ্রমিকদের ঠিকভাবে বেতন দিতে পারে না, অথচ কিছু শ্রমিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা এ ধরনের নামে কিংবা সুবিধাজনক খাত দেখিয়ে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে শ্রমিকদের উন্নয়নে যে অর্থ সরকার দিচ্ছে, সেটি আসলে তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের অনৈতিক ব্যয় ও খরচ দেখিয়ে আসছে কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। তাই বিজেএমসি থেকে কতটুকু কারা কীভাবে সুবিধা নিয়েছে, সেটি দেখার জন্য আন্তর্জাতিক মানের অডিটের মাধ্যমে এগুলো বের করা দরকার। সেটি কারখানা পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হতে হবে। বিষয়টি নিয়ে বিজেএমসি কর্তৃপক্ষ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও মোট ৪৯৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছিল বিজেএমসি। অন্যদিকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লোকসান ৫৭৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। লোকসানের কারণ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ সময় কারখানাগুলোয় অতিরিক্ত ৯ হাজার ১৭৭ জন অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োজিত করতে হয়েছে। এজন্য ৪৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, যা মোট লোকসানের ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৭৫ দশমিক ১১ কোটি টাকা, যা ক্ষতির ১৩ দশমিক ১০ শতাংশ। সক্ষমতা অনুসারে উৎপাদন না হওয়ার কারণেই ২০১৮-১৯ অর্থবছর সবচেয়ে বেশি লোকসানে পড়তে হয়েছে সংস্থাটিকে, যার পরিমাণ ৩৩৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা বা মোট লোকসানের ৫৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। বিশ্লেষণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বাবদ ২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ক্ষতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সামাজিক দায়বদ্ধতা বাবদ ২২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা জানানো হয়েছে বিশ্লেষণে। যদিও বিষয়টিতে আপত্তি তুলছেন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার বেশ কয়েকটি শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা। এ বিষয়ে যশোরের কার্পেটিং জুট মিল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বাদশা মিয়া এবং খুলনার প্লাটিনাম জুট মিলের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ন কবির খান বণিক বার্তাকে জানান, সিবিএ অফিস চালানোর জন্য কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বরাদ্দ তারা পান না। কোনো ধরনের আন্দোলন হলে মিল বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা থেকে তারা নিজ উদ্যোগে শ্রমিকদের বুঝিয়েছেন। টাকার বিনিময়ে কোনো কাজ করেননি। ফলে এখানে অর্থ আসার কোনো প্রয়োজনও নেই। জানা গেছে, বর্তমানে দেশে পাটপণ্য উৎপাদনে বিজেএমসির অবদান মাত্র ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। রফতানিতে এ হার আরো কম, ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। নামমাত্র উৎপাদন ও অনুল্লেখ্য রফতানির জন্য সরকারি বাজেট থেকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির মাধ্যমে সংস্থাটির মিলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রয়োজনের অধিক শ্রমিক দিয়ে এসব মিল পরিচালনা করা হলেও সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে না পারারও অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রতি বছরই বাড়তে থাকে লোকসানের পরিমাণ। স্বাধীনতার পর অল্প কয়েকবার মুনাফার দেখা পেয়েছে সংস্থাটি। এদিকে অপ্রয়োজন হলেও সংস্থাটির কারখানাগুলোয় প্রতি বছর নিয়োগ দেয়া হয়েছে প্রচুর শ্রমিক। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও বিজেএমসির কারখানাগুলোয় শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৬২ হাজার ১১৩ জন। প্রয়োজনের অধিক শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হলেও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়নি। উল্টো তা ছিল বরাবরের মতোই নিম্নমুখী। ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও সংস্থাটির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৬৪১ টন, এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৬৯ হাজার ১১১ টন। এ সময় দৈনিক গড় উৎপাদন ছিল ২৪৯ দশমিক ৬২ টন, যা আগের অর্থবছরেও (২০১৭-১৮) ছিল ৪৭০ দশমিক ৫৭ টন।

  • গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) দেশে চাল ও গম আমদানি হয়েছে প্রায় ৬৪ লাখ ৩৪ হাজার টন, যা গত চার দশকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর মধ্যে চালের পরিমাণ খুবই সামান্য। আমদানির সিংহভাগই...

  • ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১১ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) গড়ে প্রতি মাসে ব্যয় হয়েছে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ছিল গড়ে ৫ দশমিক ২২ শতাংশ। কিন্তু অর্থবছরের শেষ মাসে গিয়ে বড় ধরনের উল্লম্ফন হয়েছে ব্যয় ও বাস্তবায়নে। জুনে ব্যয় হয়েছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে এডিপিতে মোট ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা, আর বাস্তবায়নের হার ছিল ৮০ দশমিক ২৮ শতাংশ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে এডিপি ব্যয় ও বাস্তবায়নের এসব তথ্য উঠে এসেছে। বার্ষিক প্রতিবেদনটি শিগগির আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ও ব্যয়ে রেকর্ড গড়েছিল বাংলাদেশ। এ সময়ে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়নের হার ছিল ৯৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তবে রেকর্ডের পরের অর্থবছরে এসে বাস্তবায়নে আবারো পতন ঘটে। দুই যুগের বেশি সময় পর বাস্তবায়নের হার সর্বনিম্নে ঠেকে সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে। আইএমইডির সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের নিজস্ব কিছু উদ্ভাবনী কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যয় ও বাস্তবায়নে রেকর্ড অর্জন করেছিলাম। কিন্তু সংগত কারণেই সেটি ধরে রাখতে পারিনি। তবে আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না। করোনার আগেই পরিকল্পনামন্ত্রী বিভাগীয় পর্যায়ে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক শুরু করেছিলেন। প্রতি মাসে ডিসিদের নিয়ে আমিও বৈঠক করেছি। আইএমইডির মহাপরিচালকরা পিডিদের সঙ্গে প্রতি মাসে কমপক্ষে ছয়টি বৈঠক করতেন। কিন্তু সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের শেষদিকে সাধারণ ছুটির কারণে আমরা কিছুটা পিছিয়ে পড়ি। অর্থবছরের শেষ মাসে অর্থ ব্যয় ও বাস্তবায়নে এমন উল্লম্ফন কতটা যৌক্তিক এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, আমাদের আর্থিক ব্যয়টা সব সময়ই ফিজিক্যাল ব্যয় থেকে কম হয়। সাধারণত বছরের শেষদিকে এসে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। তবে তদারকির মাধ্যমে এ দুটি ক্ষেত্রে আরো সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রীর দিকনির্দেশনা এসেছে। উন্নয়ন ও জীবন দুটিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে যথাসময়ে এডিপি বাস্তবায়ন এবং আরো কার্যকরভাবে অর্থের ব্যবহার নিশ্চিত করতে আমরা নতুন কর্ম-উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১১ মাস পর্যন্ত এডিপিতে মোট ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৪২১ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়নের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। তবে অর্থবছর শেষে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু জুনেই ৪৬ হাজার ১০৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়। যদিও পূর্ববর্তী মাসগুলোতে এটি ছিল খুবই কম। গত অর্থবছরের শেষ ছয় মাসের এডিপি ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, মে মাসে ১৬ হাজার ৫৮১ কোটি, এপ্রিলে ৮ হাজার ১৩৬ কোটি, মার্চে ১০ হাজার ৫৬১ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ১১ হাজার ১৬৩ কোটি, জানুয়ারিতে ১২ হাজার ২৬১ কোটি এবং ডিসেম্বরে ১৫ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। বিগত অর্থবছরগুলোয় এডিপি বাস্তবায়ন হার ৯০ শতাংশের বেশি হলেও ২৭ বছর পর এবারই তা ৮০ শতাংশে নামল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। কিন্তু মাঝপথে এসে গত মার্চে বরাদ্দ কমিয়ে সংশোধিত এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ১ হাজার ১৯৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ফলে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের আরএডিপির অর্থ ব্যয় হয়নি ৩৯ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড়ের প্রয়োজন হবে না। যদি অর্থ মন্ত্রণালয় এ অর্থ ছাড়ও করে, তাহলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত চলে যাবে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত অর্থবছর এডিপি বাস্তবায়ন হার কম হওয়ার প্রধান কারণ নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। করোনার কারণে চলতি বছরের ২৬ মার্চ থেকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। মার্চ পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৪৫ শতাংশ। এপ্রিল পর্যন্ত তা বেড়ে হয়েছে ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে মাত্র ৪ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছিল। মে মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৫৭ শতাংশে উন্নীত হয়। আর বছর শেষে এডিপি বাস্তবায়িত হয় ৮০ শতাংশ। সে হিসেবে এক মাসে ২৩ শতাংশ টাকা খরচ হয়েছে। টাকার অংকে ৪৬ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। এর আগে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে ৩৭ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো ব্যয় করতে পেরেছে ৭৯ হাজার ৭৮৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। নয় মাসে অর্থাৎ মার্চ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছিল ৯০ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার ছিল ৪৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বা এপ্রিল পর্যন্ত যা ছিল ৪৯ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং টাকার অঙ্কে ব্যয় হয়েছিল ৯৮ হাজার ৮৪০ টাকা। সাধারণ ছুটিতে এপ্রিল, মে ও জুনে উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম স্থবির ছিল। বেশির ভাগ প্রকল্পের কাজ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আরএডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শুধু বিল পরিশোধ ছাড়া তেমন কিছুই হয়নি। আইএমইডির প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত অর্থবছর সবচেয়ে কম ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ আরএডিপি বাস্তবায়ন করেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। এ তালিকায় পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ ৩৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ, খাদ্য মন্ত্রণালয় ৪৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, জননিরাপত্তা বিভাগ ৫১ শতাংশ, আইন ও বিচার বিভাগ ৫১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তবে সর্বোচ্চ আরএডিপি বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ, স্থানীয় সরকার, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক, সেতু বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।

  • দুই ধাপে চার সপ্তাহ ধরে বন্যা চলছে দেশে। ২৮ জেলায় চলমান এই বন্যায় এরই মধ্যে প্লাবিত হয়েছে দেশের ৩০ শতাংশ এলাকা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে দুর্গত এলাকার মানুষ। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার হেক্টর জমির ফসল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের উজানে বাংলাদেশ সংলগ্ন ভারতীয় অংশে ধাপে ধাপে ভারি বৃষ্টিপাতই দীর্ঘমেয়াদি বন্যার মূল কারণ। তৃতীয় ধাপে ভারি বৃষ্টিপাত ও ঢল নামলে বাড়তে পারে বন্যার ব্যাপকতা। সেই সঙ্গে বাড়বে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও। তবে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শঙ্কা থাকলেও চলতি বছরের বন্যা এখন পর্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেনি। বন্যার পানি আরো তিন থেকে পাঁচদিন পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর পর থেকে পরিস্থিতি ক্রমে স্থিতিশীল হয়ে আসবে এবং উন্নতির দিকে যাবে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আলরাজি বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা আশা করছি আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। হয়তো আরো তিন-চারদিন পানি বৃদ্ধি পেতে পারে। এর পরই বন্যার পানি নামতে শুরু করবে। তবে বন্যা পুরোপুরি শেষ হতে আরো দুই সপ্তাহ সময় নেবে। সব মিলিয়ে এবারের বন্যা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছবে না। স্থায়িত্ব ও ক্ষতির দিক দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বন্যা হয়েছিল ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে। ১৯৯৮ সালে বন্যার স্থায়িত্বকাল ছিল ৩৩ দিন। ২০০৭ সালে ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘ফ্লাডস ইন বাংলাদেশ: হিস্ট্রি, ডাইনামিকস অ্যান্ড রিথিংকিং দ্য রোল অব দ্য হিমালয়াস’ শীর্ষক এক বইয়ের তথ্য বলছে, ১৯৯৮ সালের বন্যায় দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। অন্যান্য বছরের বড় বন্যাগুলোর মধ্যে ১৯৮৮ সালে ৬৩, ২০০৭ সালে ৫৩, ১৯৮৭ সালে ৪০, ১৯৭৪ সালে প্রায় ৩৭, ২০০৪ সালে ৩৭ দশমিক ২৭, ১৯৫৫ সালে প্রায় ৩৬ এবং ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। ১৯৯৮ সালে বন্যার স্থায়িত্বকাল ছিল ৩৩ দিন। এরপর ২০১৯ সালের বন্যার স্থায়িত্ব ছিল প্রায় তিন সপ্তাহ। এছাড়া চলতি বছরের মতোই বন্যা হয়েছিল ২০০৪ সালে। ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ১৯৯৮ ও ১৯৮৮ সালের বন্যা। ওই দুই বছরই ফসল ও অন্যান্য সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছিল। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সেই ধরনের ক্ষতি না হলেও স্থায়িত্বে সেই বছরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। চলমান বন্যা এরই মধ্যে ২৭ দিন অতিক্রম করেছে। দুই ধাপের বন্যায় এরই মধ্যে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮০৬ হেক্টর ফসলি জমিতে বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ২৫ জুন থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত মোট ১৪টি জেলায় প্রায় ৭৬ হাজার ২১০ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ৪১ হাজার ৯১৮ হেক্টর জমি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টাকার অংকে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৪৯ কোটি। মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৪৪ হাজার। দ্বিতীয় ধাপে ১১ থেকে ২১ জুলাই সময়ে নতুন করে আরো ১২টি জেলায় মোট ১৩টি ফসলের প্রায় ১ লাখ ১ হাজার ৫৯৬ হাজার হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়। এবারের বন্যার বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বণিক বার্তাকে বলেন, বন্যার স্থায়িত্ব সম্পর্কে এখনই বলা সম্ভব নয়। বন্যার স্থায়িত্বের চেয়ে ফসল উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষার দিকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এজন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। ভূপ্রাকৃতিক কারণেই প্রতি বছর চরে বন্যা দেখা দেয়। এবারো তা-ই হয়েছে। প্রায় এক মাস ধরে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় কুড়িগ্রামের প্রায় তিন শতাধিক চরাঞ্চলের চার লাখ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। ঘর-বাড়ি ডুবে যাওয়ায় নৌকা, কলাগাছের ভেলা ও ঘরের মাচানে কোনো রকমে দিন পার করছে দুর্গতরা। উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতুলির চরের মুসা মিয়া জানান, বন্যা এত দীর্ঘ হবে সেটা কল্পনাও করতে পারিনি। পানি সামান্য কমার পর আবারো বৃদ্ধি পায়। কাজকর্ম নেই। ঘরে খাবার নেই। বউ, বাচ্চা নিয়ে খেয়ে না খেয়ে আছি। কোনো ত্রাণ পাইনি। ত্রাণ না পেলে আর বাঁচার উপায় থাকবে না।

  • দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশ ভুটান। আয়তন ও অর্থনৈতিকভাবে ছোট হলেও নাগরিকদের পরিশোধিত পানির প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য নেই দেশটির। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন বলছে, ভুটানের ৯৯ শতাংশের বেশি মানুষ পাইপলাইনে সরবরাহ করা পরিশোধিত পানি পাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশে এখনো পরিশোধিত পানি সুবিধার আওতায় রয়েছে মাত্র ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ। বিশ্বব্যাংক তাদের ওই প্রতিবেদনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পানি সরবরাহ, গুণগত মান এবং দাম নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে। সেখানে পাইপলাইনে সরবরাহকৃত পানির বিষয়ে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সরবরাহকৃত পরিশোধিত পানি প্রাপ্তির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভুটান। দেশটির ৯৯ শতাংশের বেশি মানুষ সরবরাহকৃত পানি সুবিধা পায়। অন্যদিকে মালদ্বীপে ৪৭ দশমিক ৮০ শতাংশ, নেপালে ৪৭ দশমিক ৪০ শতাংশ, ভারতে ৪৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৩৮ দশমিক ২৮ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ ও আফগানিস্তানে ২১ দশমিক ৬৭ শতাংশ মানুষ পাইপলাইনে সরবরাহ করা পানি সুবিধার আওতায় রয়েছে। জনগোষ্ঠীর পাইপলাইনে পানি সুবিধা প্রাপ্তির তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার নিচে রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান। দেশে মাত্র ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ এ সুবিধার আওতায় আছে। এক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে পার্থক্যও বেশ। শহরের প্রায় ২২ দশমিক ৬৬ শতাংশ মানুষ পাইপলাইনে পরিশোধিত পানি পেলেও গ্রামে এ হার মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নিরাপদ পানি সরবরাহের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ বিষয়ে সুস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু এত কমসংখ্যক মানুষ নিরাপদ পানি সুবিধার আওতায় থাকলে সেসব লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ওয়াটার এইড বাংলাদেশের সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর এবং বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক মো. খায়রুল ইসলাম এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, নেপাল ও আফগানিস্তানের তুলনায় আমাদের পিছিয়ে থাকাটা দুর্ভাগ্যজনক। এটি প্রেস্টিজ ইস্যু, পিছিয়ে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকার যদি রাজনৈতিকভাবে কোনো টেকসই অঙ্গীকার না নেয়, তাহলে দেশের মানুষের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছানো খুব কষ্টসাধ্য হবে। ভারতে এরই মধ্যে প্রতিটা ঘরে পাইপলাইনে পানি যাবে এমন অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। সব দেশেরই নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন দরকার। আমাদের দেশে কিছুটা পরিকল্পনা করা হচ্ছে, কিন্তু সেটি একেবারেই শহরকেন্দ্রিক। ফলে পানি নিয়ে শহর ও গ্রামে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি করছি আমরা। আবার সরবরাহকৃত পানির মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন ও জটিলতা। মহামারী পরিস্থিতিতে হাত ধোয়ার যে প্রচলন আমরা দেখছি, সেটিও সরবরাহকৃত পানি ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে ২২৫ কোটি থেকে ২৩০ কোটি লিটার পানির প্রয়োজন। আবার ওয়াসা যে পানি সরবরাহ করছে, তার ২২ শতাংশ ভূূ-উপরস্থ উৎস থেকে এবং ৭৮ শতাংশ ভূ-গর্ভস্থ উৎস থেকে উৎপাদন করা হচ্ছে। ‘জাতীয় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন নীতিমালা, ১৯৯৮ অনুযায়ী’ সমগ্র দেশের পল্লী এলাকায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক নিরাপদ পানির উৎস স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সবার জন্য নিরাপদ সুপেয় পানি সরবরাহ করা, স্যানিটারি ল্যাট্রিন সুবিধাভোগী নগরবাসীর অনুপাত ১০০ শতাংশে এবং গ্রামীণ জনগণের অনুপাত ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। সেই লক্ষ্যে সারা দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নয়নের পরিকল্পনায় সম্প্রতি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। চলতি বছরের শুরুতে সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ শীর্ষক প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৮৫০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এজন্য সারা দেশে ৯০ হাজার ৬৩৬টি অগভীর নলকূপ এবং ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৭৭টি গভীর নলকূপ স্থাপন হবে। সাবমার্সিবল পাম্প ও জলাধারসহ অগভীর নলকূপ ২ লাখ ৬ হাজার ৬৬৪টি এবং সাবমার্সিবল পাম্প ও জলাধারসহ গভীর নলকূপ হবে ১ লাখ ৭০ হাজার ২২২টি। এছাড়া অন্যান্য যন্ত্র স্থাপনের মাধ্যমে গ্রামে পানি সরবরাহ বাড়ানো হবে। এদিকে শহরে পানি সরবরাহ বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নে রয়েছে ধীরগতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ও মাঝারি শহর অঞ্চল এবং সেসব শহরে বস্তিতে বসবাসকারীদের পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ বাড়াতে হবে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে পারলে নারীদের পানি সংগ্রহ সহজ হবে। শিশুরা পানিবাহিত রোগ থেকে দূরে থাকতে পারবে। ফলে তাদের স্কুলে উপস্থিত নিশ্চিত হবে। তাছাড়া এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে।

  • উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে দেশের ৮৫ শতাংশ কৃষিজমি। অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপজ্জনকভাবে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতও। একই সঙ্গে জমি, উপকরণ ও প্রযুক্তিগত দিক থেকেও রয়েছে নানা ধরনের সংকট। এসব প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গে করেই এগিয়ে চলেছে দেশের শস্য উৎপাদন খাত। এরই মধ্যে সাত কোটি টনের মাইলফলক অতিক্রম করেছে দেশের বার্ষিক শস্য উৎপাদনের পরিমাণ। ২০৩০ সালের মধ্যে খাতটির উৎপাদনশীলতাকে দ্বিগুণে উন্নীত করতে চাইছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন হলে নিঃসন্দেহে তা হয়ে উঠবে কৃষি খাতের জন্য অনেক বড় একটি অর্জন। তবে এ অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আরো গতিশীল করে তোলার জন্য শস্য খাতের প্রতিবন্ধকতাকে দূর করার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, খাদ্যে টেকসই স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে শস্য উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু শস্য খাতের নানা প্রতিবন্ধকতা ও দুর্বলতা থেকে গেলে খাদ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টি ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদন হয়েছে ৭ কোটি ১৫ লাখ টন। এর মধ্যে প্রধান দানাদার খাদ্যশস্যগুলোর (চাল, ভুট্টা ও গম) উৎপাদন চার কোটি টন ছাড়িয়েছে। আলু উৎপাদন হয়েছে ৯৭ লাখ টন। তেলবীজ উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ টন। উৎপাদনের এ ধারাকে আরো বেগবান করতে শস্যের উৎপাদনশীলতাকে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০১৫ সালের তুলনায় দ্বিগুণ করার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ২০১৫ সালে দেশে চাল ও গমের হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদনশীলতা ছিল তিন টনের বেশি। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ছয় টনের বেশি উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। ভুট্টার উৎপাদনশীলতা ছিল প্রায় সাত টন, যা প্রায় ১৪ টনে উন্নীত করতে চাইছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০১৫ সালে আলুর হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা ছিল ২০ দশমিক ৭৬ টন। ২০৩০ সালের মধ্যে এটিকে ৪১ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া একই সময়ের মধ্যে ডাল শস্যের উৎপাদনশীলতা ১ দশমিক ১৪ থেকে ২ দশমিক ২৮ টন ও তেলবীজের হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা ১ দশমিক ১৮ টন থেকে ২ দশমিক ৩৬ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। পরিসংখ্যান বিবেচনায় বলা চলে, এখন পর্যন্ত এ বর্ধিত উৎপাদনশীলতার লক্ষ্য অর্জনের পথেই রয়েছে দেশের কৃষি খাত। ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত চাল ও গমের হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদনশীলতা অর্জন করা গিয়েছে যথাক্রমে ৩ দশমিক ১২ টন ও ৬ দশমিক ৬ টন পর্যন্ত। ভুট্টার ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা অর্জন হয়েছে ৮ দশমিক ৭১ টন। এ সময়ে আলুর হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ টনে। পাশাপাশি ডাল শস্যের ক্ষেত্রে হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ২৭ টন। তেলবীজের ক্ষেত্রে এ বর্ধিত উৎপাদনশীলতার পরিমাণ ১ দশমিক ৩৪ টন। শস্য খাতের এ মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় সবক’টি শস্যের উৎপাদনশীলতাকে দ্বিগুণ করার লক্ষ্য অর্জন করা গেলে তা হবে অসম্ভবকে সম্ভব করার নামান্তর। এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা গেলে দেশে শস্য উৎপাদনের বহুমুখীকরণ কার্যক্রমও অনেক বেশি গতিশীল হয়ে উঠবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যদি উৎপাদন খরচ বাড়েও তার পরও বাড়তি শস্য উৎপাদনের মাধ্যমে মুনাফার ধারা ধরে রাখতে সক্ষম হবেন কৃষকরা। এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের কৃষি খাতের কার্যক্রম এখন শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কৃষি খাতই এখন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রধান হাতিয়ার। পাশাপাশি দেশের আর্থসামাজিক বিভিন্ন সূচকের উন্নয়নের অন্যতম অনুষঙ্গ কৃষি খাত। শস্য খাতে যেসব কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করা হলে যেকোনো অসম্ভবকেই সম্ভব করা যাবে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী আরো বলেন, আমার এ বিশ্বাসের মূল কারণ সরকার থেকে কৃষকদের নীতিসহায়তা দেয়ার পাশাপাশি বিজ্ঞানী, সম্প্রসারণকর্মী ও বেসরকারি খাতও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করে যাচ্ছে। কৃষিকে লাভজনক পর্যায়ে উন্নীত করতে বাণিজ্যিক কৃষিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। উপকরণ সহায়তা, অপ্রচলিত শস্যকে জনপ্রিয় করা ও কৃষিপণ্যকে রফতানিমুখী করতে নীতিসহায়তাও বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি সব ধরনের প্রযুক্তিও দ্রুততার সঙ্গে কৃষকের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে। তবে এ লক্ষ্যপূরণের পথে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে দেশের কৃষি খাতের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো। জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৭০ সাল নাগাদ দেশে ধানের উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার বড় ধরনের আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতে কৃষকদের এখন খরা, লবণাক্ততা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি বা জলাবদ্ধতার মতো প্রতিকূলতাগুলোকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি, যা শস্য খাতের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বড় বাধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি মৌসুমেও ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও দীর্ঘমেয়াদি বন্যার মতো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে কৃষকদের। শুধু এ দুই দুর্যোগের কারণেই কৃষি খাতের সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকায়। এ কারণে সংশ্লিষ্টরাও বর্তমানে বিভিন্ন শস্যের ঘাতসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের ওপর জোর দিচ্ছেন বেশি। শস্য উৎপাদন খাতের আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস। বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) গবেষণা বলছে, দেশে আবাদযোগ্য জমির প্রায় ৮৫ শতাংশেরই উর্বরতা শক্তি হ্রাস পেয়েছে। এ অবস্থায় জমিতে রাসায়নিক সারের বদলে জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে নীতিমালা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাসায়নিক সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সারের মূল্যে ভারসাম্য আনারও। অতিমাত্রায় সেচনির্ভর ফসল উৎপাদনে ঝুঁকে পড়া, সেচের পানির অদক্ষ ব্যবহার ও ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণে জোর না দেয়ার কারণে বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ জেলায়ই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় আবার সেচব্যয়ও বাড়ছে কৃষকদের। দেশে বর্তমানে প্রতি কেজি বোরো আবাদে পানির প্রয়োজন পড়ছে প্রায় তিন হাজার লিটার। এজন্য সেচের চাপ কমাতে আউশ আবাদে কৃষকদের উৎসাহিত করছে সরকার। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম হওয়ার পাশাপাশি সেচের ওপর কম নির্ভরতা, সরকারের ভর্তুকি সহায়তা কার্যক্রম ও পরিবেশগত দিক বিবেচনায় কৃষকরাও এখন আউশ আবাদের দিকে ঝুঁকছেন বেশি। তবে এক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। আউশ ও আমন আবাদের ক্ষেত্রে বোরোর মতো উচ্চফলনশীল জাতের সংখ্যা বেশ কম। নতুন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে এ সংকট দূর করা গেলে সামনের দিনগুলোয় ধানের হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা ছয় টনে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টি অনেক সহজ হবে। পাশাপাশি অন্যান্য শস্য আবাদের ক্ষেত্রেও জমির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, সারা দেশে ধানের আবাদ ও উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। ভূপ্রাকৃতিক গঠন, কৃষক ও ভোক্তাদের চাহিদাকে বিবেচনায় রেখে শতাধিক জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে আট টন পর্যন্ত ফলন দিতে পারে এমন জাতও উদ্ভাবন করা হয়েছে। আউশ ও আমনের নতুন এসব জাত কৃষকের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে। সামনের দিনগুলোয় ধানের জমি অন্যান্য শস্যে স্থানান্তর হবে। ফলে উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার মাধ্যমে চালের প্রয়োজনীয় উৎপাদন ধরে রাখার পাশাপাশি অন্যান্য শস্যের আবাদ বাড়ানোও সম্ভব হবে। কম উৎপাদনশীলতার কারণে কৃষকদের মধ্যে এখন চারটি প্রধান ডাল শস্য আবাদে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে কম। ফলে এসব পণ্যের যেটুকু উৎপাদন হচ্ছে, তা দিয়ে স্থানীয় চাহিদার এক-তৃতীয়াংশও পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ চাহিদা প্রতিনিয়ত বেড়ে চললেও গত দুই অর্থবছরে দেশে ডাল শস্যের আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার হেক্টর। কম উৎপাদনশীলতার কারণে কৃষক সেভাবে লাভবান হতে না পারলেও পণ্যগুলো আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে বাংলাদেশের। গত ১০ অর্থবছরে দেশে ডাল শস্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় ডালের হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা সোয়া এক টন থেকে আড়াই টনে উন্নীত করা গেলে কৃষকের পণ্যগুলো আবাদে উৎসাহিত করার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানোও সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে দেশে বার্ষিক ৬০ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে গম উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৩ লাখ টন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পণ্যটির উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টি এখন গতি হারিয়েছে। তবে ঘাতসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করা গেলে এ উৎপাদন সহজেই বাড়ানো সম্ভব হবে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের কৃষিতে সম্ভাবনার সবটুকুই রয়েছে। সামনের দিনগুলোয় অর্থনৈতিক কাঠামোর অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তিই হবে কৃষি। তবে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে শস্যগুলোর মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ জরুরি। তা না হলে কৃষকের কাছে সেটি পৌঁছানো কঠিন হবে। যে শস্য কম লাভজনক, সেটি কৃষকের কাছে পৌঁছানো কষ্টকর হবে। এটির পাশাপাশি কৃষকের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে সব ধরনের প্রযুক্তি পৌঁছাতে হবে। প্রণোদনা ও অর্থায়ন কাঠামোয় পরিবর্তন এনেই সেটি করতে হবে। উৎপাদনের পাশাপাশি নজর দিতে হবে বিপণনেও। এখনই কৃষিপণ্যের বিপণনে ডিজিটাল মাধ্যমের প্রবর্তন করতে হবে। কৃষকের খরচ কমিয়ে এনে মুনাফা বৃদ্ধির দিকে নজর বাড়াতে হলে এ খাতে উন্নত বিশ্বের মতো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ছোঁয়া দ্রুত পৌঁছাতে হবে। তাহলে দেশের কৃষি খাত একটি টেকসই রূপান্তর পাবে।

To Top