অর্থ সংকট মেটাতে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অংকের ঋণ নেয় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) অধীন চিনিকলগুলো। শুধু আখচাষীদের ঋণ দেয়ার উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন সময়ে...
অর্থ সংকট মেটাতে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অংকের ঋণ নেয় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) অধীন চিনিকলগুলো। শুধু আখচাষীদের ঋণ দেয়ার উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন সময়ে...
যমুনা নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক করিডোর ও নৌপথের বাণিজ্য সম্ভাবনা, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং নাব্যতা সংকটের প্রভাব নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিকের শেষ পর্ব যমুনাকে ঘিরে অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য সৃজনের কথা রয়েছে শত বছরের...
যমুনা নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক করিডোর ও নৌপথের বাণিজ্য সম্ভাবনা, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং নাব্যতা সংকটের প্রভাব নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব ব্রিটিশ আমলে দেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌবন্দর ছিল সিরাজগঞ্জে। যমুনা নদীর সেই বন্দরকে ঘিরেই ছোট সিরাজগঞ্জ শহরে তৈরি করা হয়েছিল চারটি রেল স্টেশন। পাটপণ্য পরিবহনসহ আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যে ব্যবহার হতো এ বন্দর। কালের বিবর্তনে সিরাজগঞ্জের সেই নৌপথ ও বন্দর কোনোটিই নেই। রেল স্টেশন চারটিও বন্ধ। শুধু সিরাজগঞ্জের এ বন্দর নয়, ৫৫ বছর আগেও বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মধ্যে নৌযান চলাচলে গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহার করা হতো যমুনা নদীকে। কুড়িগ্রামের চিলমারী হয়ে বাহাদুরাবাদ, সিরাজগঞ্জ থেকে দুদিকে চলে যেত নৌযান। একটি নৌপথ ছিল গড়াই নদী হয়ে কলকাতা, অন্যটি চলে যায় চাঁদপুর ও বরিশাল হয়ে। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে ১৯৬৫ সালে বন্ধ হয়ে যায় নৌপথটি। উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় বিভিন্ন ধরনের কৃষি উপকরণ, জ্বালানি তেল, পণ্য ও দানাদার খাদ্যশস্য পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে যমুনার নৌপথ। পণ্য পরিবহনে বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও নাব্যতা সংকটে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে জাহাজ ভিড়তে প্রায়ই অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পণ্যবাহী জাহাজ চলার জন্য স্বাভাবিক সময়ে নৌপথে ১০-১৫ ফুট পানির গভীরতা প্রয়োজন। কিন্তু পাবনার বেড়া উপজেলার প্যাঁচাকোলা থেকে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার অংশের চ্যানেলটিতে পানির গভীরতা নেমে এসেছে ৬-৭ ফুটে। ফলে বাঘাবাড়ী বন্দরে সরাসরি আসতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে জাহাজ। এতে উত্তরাঞ্চলের পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যের সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এ বিষয়ে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, সারা বিশ্বেই নদীকে ঘিরে অর্থনীতি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় যমুনাকে ঘিরেই এ অঞ্চলে বড় বড় জাহাজ এবং নৌ-পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। আমরা ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য যমুনাকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা গ্রহণ করে সে অনুসারে কাজ করছি। এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণ যেন যমুনা নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠে, সে ব্যবস্থা করতে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বাস্তবায়নে ভবিষ্যতে যমুনা নৌপথে বড় বড় জাহাজ চলবে। যমুনা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ী নৌবন্দর ব্যবহার করেই অর্ধকোটি টনের বেশি সার, জ্বালানি তেল, সিমেন্ট, কয়লাসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে পাঠানো হয়। নৌপথটি ব্যবহার করে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। যদিও নাব্যতা সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে নেমে এসেছে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরের মান। তার পরও বন্দরটি ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিলে নৌপথটি ভারত ও নেপালের সঙ্গে বাণিজ্যের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নৌপথে পণ্য পরিবহন খরচ সড়ক পরিবহনের চেয়ে প্রায় অর্ধেক। আবার নৌপথে পণ্য পরিবহন করলে পরিবেশের ক্ষতি যেমন কম হয়, তেমনি পণ্যের গুণগত মানও ধরে রাখা যায়। এসব বিবেচনায় নিয়ে যমুনাকেন্দ্রিক এ নৌপথের উন্নয়ন ঘটালে নদীর দুই পাড়ে শিল্প গড়ে উঠবে, যা দেশে অর্থনীতির গতিকে বেগবান করবে। সিরাজগঞ্জের সচেতন নাগরিক ও স্থানীয় যমুনা প্রবাহ পত্রিকার সম্পাদক মোস্তাফা কামাল তারা বণিক বার্তাকে বলেন, যমুনা নদীর সঠিক ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে পারলে এ অঞ্চলে বাণিজ্যের মহাজাগরণ সম্ভব। অবহেলায় আমরা শত বছরের ঐতিহ্য নষ্ট করে ফেলেছি। যমুনার পানি এত দ্রুত কমে যাচ্ছে যে ভারী নৌযান চলাচল করতে পারে না। অথচ ভারী নৌযান চলাচলের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকলেও সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ভারতের আসাম থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে। ওই নদ যমুনা নাম ধারণ করে গোয়ালন্দের কাছে পদ্মা নদীতে মিশেছে। এ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। যদিও যমুনা নদীর শাখা ও উপনদীর দৈর্ঘ্য প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার। প্রতি বছর যমুনা নদীতে ১২০ কোটি টন পলি ও বালি পড়ছে। এসব পলি পানিপ্রবাহের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু পানিপ্রবাহের গতি কম থাকায় নদীর বিভিন্ন স্থানে চর জেগে উঠছে। জমা এসব পলি ও বালি ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে সরানো হচ্ছে না। দেখা দিচ্ছে নাব্যতা সংকট। ফলে বাণিজ্য সম্ভাবনা ক্ষয়ে যাচ্ছে। নৌপথে পণ্য পরিবহন খরচ সড়ক পরিবহনের চেয়ে প্রায় অর্ধেক। এ বিষয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় নতুন নৌপথ তৈরি করতে পারছি না, আবার পরীক্ষিত নৌপথগুলোকে রক্ষায় চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি। পদ্মাকে ঘিরে আরিচা থেকে ভারত পর্যন্ত শিল্পায়নের সুযোগ আমরা যেমন কাজে লাগাতে পারছি না। আবার শত শত বছরের গড়ে ওঠা একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চলকে মৃতপ্রায় করে ফেলেছি। যমুনা নদীকে ঘিরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত নৌপথটি অবহেলার মাধ্যমে নিঃশেষ করে দিয়েছি। যমুনা নদীকে বৈজ্ঞানিক ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করতে না পারার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানিপ্রবাহ, ক্ষয়ে যাচ্ছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। সামগ্রিক বিবেচনায় নদীকে ড্রেজিং যেমন করা হচ্ছে না, তেমনি নদীভাঙন ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অবহেলা রয়েছে। অথচ যমুনা নদীকে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নৌপথ চালু করার পাশাপাশি দুই পাড়ে শিল্প-কারখানা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, নদীভাঙন চলতে থাকলে শিল্পায়ন করা সম্ভব নয়। আবার পাইলট আকারে কোনো প্রকল্পও টেকসই হবে না। তাই দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে হবে।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার আমলাপাড়ায় যমুনাপারের বাসিন্দা মর্জিনা বেগম। একসময় নদীর ওপারে বসতভিটা ও কিছু আবাদি জমি ছিল তাদের। কিন্তু নদীভাঙনে সব হারিয়েছেন। সেই থেকে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন এ...
ছোট ছোট আইলে খণ্ডিত জমি। জমির আয়তন এতই ছোট যে সেখানে ট্রাক্টর ও কম্বাইন হারভেস্টরের মতো বড় কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের জো নেই। পদে পদে প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয় সেচে, হয় না...
চাল উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে বেশ প্রশংসা পেয়েছে। সরকারি তথ্যে দৈনিক জনপ্রতি যে ভোগ দেখানো হচ্ছে তাতে প্রতি বছর ৫০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু উদ্বৃত্ত তো থাকছেই না, উল্টো আমদানি করে ঘাটতি মেটাতে হচ্ছে। এ ঘাটতি আরো তীব্র হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) মনে করে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দৈনিক জনপ্রতি চাল ভোগের যে তথ্য দিয়েছে তাতে বাংলাদেশর জনগণের ভোগের সঠিক চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না। বিবিএসের তথ্যে জনপ্রতি চাল ভোগের যে পরিমাণ উঠে এসেছে তার সঙ্গে বেশ পার্থক্য রয়েছে ইফপ্রি ও বিআইডিএসের তথ্যের। একজন মানুষ দৈনিক কত গ্রাম চাল ভোগ করে তা নিয়ে একটি জরিপ করেছিল ইফপ্রি। সেই জরিপে তারা দেখিয়েছিল, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে দৈনিক জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণ ছিল ৩৯৬ দশমিক ৬ গ্রাম, যা ২০১৬ সালেও ছিল ৪২৬ গ্রাম। অন্যদিকে ২০১৬ সালে দৈনিক জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণ ৪৬০ গ্রাম ছিল বলে তথ্য দিয়েছে বিআইডিএস। যদিও একই বছরে দৈনিক জনপ্রতি চাল ভোগের হিসাব ৩৬৭ গ্রাম দেখানো হয়েছে বিবিএসের সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপে। তিন সংস্থার তথ্যের তুলনা করলে দেখা যায়, জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণ ইফপ্রির চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ এবং বিআইডিএসের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ কম বলে উঠে এসেছে বিবিএসের তথ্যে। চালের মজুদ নিয়ে সঠিক পরিকল্পনার জন্য জনপ্রতি ভোগের সঠিক তথ্য থাকা জরুরি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ভোগের তথ্য অনুযায়ীই চালের চাহিদা নিরূপণ ও মজুদের পরিকল্পনা করা হয়। এক্ষেত্রে সঠিক তথ্য না থাকলে এর প্রভাব গিয়ে পড়ে মজুদ এবং সর্বোপরি বাজারের ওপর। সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলে সুন্দরভাবে লিখিত পরিকল্পনাও বাস্তবায়নে গলদ দেখা দিতে পারে বলে মনে করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, জনপ্রতি চালের যে ভোগ দেখানো হচ্ছে তাতে উৎপাদনের তথ্যের সঙ্গে ন্যূনতম ৫০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু বাজারের তথ্য সেটি বলছে না। উৎপাদন কিংবা ভোগের তথ্যেও গরমিল রয়েছে। বাজার তথ্যের সঙ্গে আমাদের প্রকাশিত সব তথ্যের মিল থাকা প্রয়োজন। তা না হলে নীতি প্রণয়নে, বিশেষ করে চাল আমদানি কিংবা রফতানির বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া মুশকিল হয়ে পড়বে। চাল উৎপাদন ও ভোগের তথ্যের ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে পর্যালোচনার প্রয়োজন মনে করলে সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে চাল আমদানির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে না। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে দেশে দৈনিক জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণ ছিল ৪১৬ গ্রাম এবং সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ২০১৬ সালে তা ছিল ৩৬৭ দশমিক ২ গ্রাম। এ সময় জনপ্রতি ভোগের পরিমাণ গ্রামে প্রায় ৩৮৬ গ্রাম ও শহরে প্রায় ৩১৭ গ্রাম ছিল। অন্যদিকে ইফপ্রির জরিপের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ২০১৮ সালে দৈনিক জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণ ৩৯৬ দশমিক ৬ গ্রামে নেমে এসেছে। যদিও তা ২০১২ সালে প্রায় ৪৬৭ গ্রাম এবং ২০১৬ সালে ছিল প্রায় ৪২৬ গ্রাম। শহর ও গ্রামে জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণে কম-বেশি পার্থক্য রয়েছে বলে জানিয়েছে ইফপ্রি। সংস্থাটির তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে গ্রামের মানুষ জনপ্রতি দৈনিক ৪১৭ গ্রাম করে চাল ভোগ করেছে, অন্যদিকে শহরের মানুষ ভোগ করেছে জনপ্রতি ৩৪২ গ্রাম। এ জরিপে ইফপ্রি একজন মানুষ নিজ বাড়িতে ও বাড়ির বাইরে যে খাবার গ্রহণ করে সে তথ্যও বিবেচনায় নিয়েছে। যেমন গ্রামের একজন মানুষ বাড়ির বাইরে দৈনিক গড়ে ১৫ গ্রাম খাবার গ্রহণ করছে, আর নিজ বাড়িতে গ্রহণ করছে ৪০২ গ্রাম। ইফপ্রি বলছে, আগামীতে জনপ্রতি চাল ভোগের পরিমাণ আরো কমে আসবে। সঠিক ভোগের তথ্য বিবেচনায় নিলে আমদানির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে। সঠিক ও নিরাপদ পরিকল্পনার জন্য জনপ্রতি ভোগ ৪৮৯ গ্রামকে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বাংলাদেশে ইফপ্রির কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. আখতার আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, পদ্ধতিগত কারণে ভোগের তথ্যের পার্থক্য হতে পারে। জনপ্রতি ভোগের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ‘সাপ্তাহিক’ ও ‘২৪ ঘণ্টার’—এ দুটো জনপ্রিয় পদ্ধতি বিবেচনায় নেয়া হয়। আমরা ভোগের সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য একজন ভোক্তার ২৪ ঘণ্টার খাবারের তথ্য হিসাব করি। সে কখন কী পরিমাণে কী কী ধরনের খাবার গ্রহণ করছে সেটি লিপিবদ্ধ করি। এ পদ্ধতিটা বেশ ব্যয়বহুল হলেও সঠিক পরিমাণটা পাওয়া যায়। কিন্তু অন্য পদ্ধতিতে পরিমাণ কম-বেশি (ওভার কিংবা আন্ডারএস্টিমেট) হওয়ার ঝুঁকি থাকে। জনপ্রতি ভোগের বাইরে চালের আরো বেশকিছু ভোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রাণী খাদ্য হিসেবে চালের কয়েক লাখ টন ভোগ করা হয়। এছাড়া ধান-চাল উৎপাদনের তথ্যটি সাধারণত মাঠ পর্যায়ের হিসাব করা হয়। মাঠের ধান থেকে ভোক্তা পর্যায়ে চাল হয়ে আসতে নানা মাত্রায় পোস্ট ও প্রি-হারভেস্ট লস হয়। সেই ক্ষতির পরিমাণ ৮-১০ শতাংশ পর্যন্ত হয়। এজন্য উৎপাদন ও ভোগ সব ক্ষেত্রেই সঠিক তথ্য থাকাটা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, চাল অত্যন্ত সংবেদনশীল কৃষিপণ্য। এ কারণে এটির ভোগ ও উৎপাদনের সঠিক তথ্য থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি জনসংখ্যার তথ্যটিও সঠিকভাবে আসা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা দেখছি, এ তিনটি তথ্যের ক্ষেত্রে বেশ ঘাটতি রয়েছে। চালের জনপ্রতি ভোগ ও জনসংখ্যার তথ্য বিবেচনায় নিলে চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু উদ্বৃত্ত থাকছে না, উল্টো মাঝে মধ্যে বেসরকারিভাবে চাল আমদানি হচ্ছে। আমরা চাল উৎপাদনে বৈশ্বিকভাবে শীর্ষ তিনে অবস্থান করছি এবং সরকারিভাবে চাল আমদানি গত কয়েক বছর বন্ধই রয়েছে। তার পরও ভোগের তথ্যের সঙ্গে উৎপাদনের তথ্যের এ গরমিল কমানোর জন্য পর্যালোচনার দাবি রাখে। হিসাব করার ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়াতে হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিটকে (এফপিএমইউ) আরো শক্তিশালী করতে হবে। না হলে কার্যকর মনিটরিং ছাড়াও সঠিক তথ্য ও নীতি গ্রহণ করা দুষ্কর হয়ে পড়বে।
দেশে তুলার বার্ষিক চাহিদা ৭৩-৭৪ লাখ বেল। এর মধ্যে দেশে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১ লাখ ৭১ হাজার বেল। ফলে চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি থাকা ৭১ লাখ বেল আমদানি করতে হচ্ছে। তুলা আমদানিতে বাংলাদেশের নির্ভরতা ভারতের ওপরই সবচেয়ে বেশি। আমদানি করা তুলার ১৯ শতাংশ বা এক-পঞ্চমাংশ ভারতীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়। তবে আমদানিনির্ভরতা কমাতে ২০৪১ সালের মধ্যে ২০ লাখ বেল তুলা উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড (সিডিবি)। কৃষি মন্ত্রণালয়াধীন প্রতিষ্ঠান সিডিবি সূত্রে জানা গেছে, মাত্র দুই লাখ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ করে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। সেজন্য হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ১০ বেলে উন্নীত করতে হবে। বাংলাদেশে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ছিল ৬ দশমিক ১৫ বেল, যেখানে বিশ্বের শীর্ষ তুলা উৎপাদনকারী দেশগুলোয় হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ১০ বেলের ওপরে। ২০১৯-২০ অর্থবছর দেশে ৪৪ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হয়েছে। এ সময় তুলা উৎপাদন হয় ১ লাখ ৭১ হাজার বেল। সম্প্রতি তুলা উন্নয়ন বোর্ডের হাইব্রিড উন্নত জাতের তুলা উদ্ভাবন ও চাষের ফলে দেশে উৎপাদন বাড়ছে। অন্যদিকে চাহিদার তুলনায় উৎপাদনের ঘাটতিতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ তুলা আমদানি করতে হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমদানি করতে হয়েছে ৭১ লাখ বেল তুলা। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরটিতে মোট তুলা আমদানির মধ্যে ভারত থেকে ১৯ শতাংশ, মালি থেকে ১৩, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১২, ব্রাজিল ও বেনিন থেকে ১০ শতাংশ করে সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশ্ব তুলা দিবস ২০২০ উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার রাতে আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারের আয়োজন করে সিডিবি। এতে তুলা উৎপাদন ও আমদানির বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন সিডিবির নির্বাহী পরিচালক মো. ফরিদ উদ্দিন। ওয়েবিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক এমপি বলেন, তুলা উৎপাদনের ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকার সব দিক দিয়ে তুলা উন্নয়ন বোর্ডকে শক্তিশালী করছে। সম্প্রতি তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ভৌত অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি, ল্যাবরেটরি স্থাপন ও দক্ষ মেধাবী জনবল নিয়োগ করছে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপযোগী নতুন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে তুলা উৎপাদন ত্বরান্বিত ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়। সিডিবি পরিচালক মো. ফরিদ উদ্দিনের সভাপতিত্বে ইন্টারন্যাশনাল কটন অ্যাডভাইজরি কমিটির নির্বাহী পরিচালক কাই হিউজেস, খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি রবার্ট ডি. সিম্পসন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান এসএম বখতিয়ার, মিসরের কটন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আল সাইদ নেগম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্টারন্যাশনাল কটন অ্যাডভাইজরি কমিটির টেকনিক্যাল ইনফরমেশনের হেড কেশব ক্রান্তি ও সিডিবির নির্বাহী পরিচালক মো. ফরিদ উদ্দিন। দেশে তুলা চাষ সম্প্রসারণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগ্রহে ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হয়। তুলা গবেষণা, তুলা চাষ সম্প্রসারণ, বীজ উৎপাদন ও বিতরণ প্রভৃতি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে সংস্থাটি। খাদ্য উৎপাদনে কোনো বিঘ্ন না ঘটিয়ে তুলা চাষ সম্প্রসারণের জন্য তুলা উন্নয়ন বোর্ড তামাক ও কৃষি বনায়ন জমিতে, লবণাক্ত, চর ও পাহাড়ি এলাকার মতো অপ্রচলিত বিভিন্ন অঞ্চলে তুলা চাষ সম্প্রসারণ করছে।
দেশে কয়েক বছর ধরেই আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে এসে পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে নিয়মিতভাবে। দেশী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে পণ্যটির আমদানিতে ভারতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতাকে। এজন্য পেঁয়াজ আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের পাশাপাশি পণ্যটির উৎপাদন বাড়ানো, বিপণন ও তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ঠেকানোসহ বেশকিছু সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সরকারি যেসব সংস্থার এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা, সেগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতার কারণে এর কোনোটিই এখনো বাস্তবায়ন করা যায়নি। এ সমন্বয়হীনতার কারণে আমদানিতে এক দেশের ওপর নির্ভরশীলতা যেমন কাটানো যায়নি, তেমনি দূর করা যায়নি উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিপণনের প্রতিবন্ধকতাগুলোও। বাজার বিশেষজ্ঞরাও পেঁয়াজের বাজারে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে সংকট তৈরির পেছনে মূলত সরকারি সংস্থাগুলোর এ সমন্বয়হীনতাকেই দায়ী করছেন। পেঁয়াজের মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ উৎপাদন হয় বাংলাদেশেই। তার পরও বাজারে প্রধান প্রভাবক হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত থেকে আমদানীকৃত পেঁয়াজ। বিষয়টিকে দেশের পেঁয়াজ বাজারের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে ২০১৩ সালেই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি)। প্রতিবেদনে আমদানিতে ভারতের ওপর অতিনির্ভরশীলতার পাশাপাশি দায়ী করা হয় অক্টোবর ও নভেম্বরে বাজারে সরবরাহ ধরে রাখা নিয়ে সমন্বয়হীনতাকে। উপকরণ সহায়তা ও সমন্বিত নীতির প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে দ্রুত কাজে লাগিয়ে এ সংকটকে সহজেই মোকাবেলা করা সম্ভব বলে মত দেয়া হয় প্রতিবেদনে। এর কয়েক বছরের মাথায় এ সংকট নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)। সেটিতেও আমদানিতে একক দেশ-নির্ভরতার বিষয়টিকে বাজার অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী করা হয়। পাশাপাশি উঠে আসে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে তদারকির অভাব ও নানা দুর্বলতার কথাও। একই কথার পুনরাবৃত্তি দেখা যায় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে। সমস্যা থেকে উত্তরণে এসব প্রতিবেদনে অত্যাবশ্যকীয় একটি ভোগ্যপণ্য হিসেবে পেঁয়াজের উৎপাদন, বিপণন ও আমদানি-সংক্রান্ত নানা সুপারিশও করা হয়েছে। কিন্তু এসব নীতি-সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নীতি-সমন্বয়হীনতার কারণে। ফলে কাটানো যাচ্ছে না পেঁয়াজের বাজার সংকটও। বছরের এ সময় বিশেষ করে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পেঁয়াজের বাজার মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে যায়। ভারত সরকার কোনো কারণে পণ্যটির রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা বা সীমা আরোপ করলেই বাংলাদেশে পেঁয়াজের মূল্য হয়ে ওঠে আকাশচুম্বী। বাজারের এ প্রবণতা সবচেয়ে প্রকট হয়ে উঠেছে ২০১২ সালের পর থেকে। গত এক দশকে বেশ কয়েকবার পণ্যটির রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ভারত। সর্বশেষ গত বছর এ নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশের বাজারে পেঁয়াজের কেজিপ্রতি দাম ৩০০ টাকায় উঠে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি বাজার তদারকির অভাব ও ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার প্রবণতাই ওই সময় পণ্যটির মূল্যকে অস্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। আগের বছরগুলোতেও এ সংকট দেখা গিয়েছিল নানা মাত্রায়। দেশে প্রতি বছর গড়ে ৮-১০ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। পণ্যটির মোট আমদানির ৭৫-৮০ শতাংশই আসছে ভারত থেকে। চীন থেকে আসে ১৫-১৯ শতাংশ। এর বাইরে মিসর, অস্ট্রেলিয়া, মিয়ানমার, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য দেশ থেকে আনা হয় যৎসামান্য পরিমাণে। এ একাধিপত্যের কারণে ভারতে উৎপাদন কমে যাওয়া, শুল্কারোপ, বন্দর জটিলতা ইত্যাদি যেকোনো সমস্যা দেখা দিলেই তা বাংলাদেশে পেঁয়াজের মূল্যে খুব দ্রুত প্রভাব ফেলছে। এ কারণে দ্রুত পণ্যটির আমদানি বাজার বহুমুখী করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি বিপণন প্রক্রিয়ার সমন্বয় সাধন করা গেলেই এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকায় তা কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন তথ্য নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপাত্তে বেশ গরমিল রয়েছে। এ গরমিলের কারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য আমদানি-সংক্রান্ত সঠিক ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণও বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পণ্যটির উৎপাদন তথ্যের গরমিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সঙ্গে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পেঁয়াজের উৎপাদন তথ্যের দূরত্ব কয়েক বছর ধরে ক্রমেই বেড়ে চলেছে। গত কয়েক বছরে সে পার্থক্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন-পাঁচ লাখ টনে। বিবিএসের হিসাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ১৮ লাখ টন। ডিএইর হিসাবে তা প্রায় ২৩ লাখ টন। এক্ষেত্রে বৈদেশিক বাণিজ্যের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এখন পোস্ট হারভেস্ট লস ও অন্যান্য ক্ষতি বাদ দিয়ে বিবিএসের হিসাবের কাছাকাছি তথ্যই গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে উৎপাদন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও মানসম্মত বীজের অভাব। তথ্যমতে, দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে শ্রমিকদের পেছনে, যা মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে খুব একটা আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। আবার সরকারিভাবেও বীজ উৎপাদনে খুব বেশি নজর নেই। অথচ এসব বিষয়ে যথাযথ নীতিসহায়তা পেলেই দেশকে পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ম্ভর করে তুলতে পারতেন কৃষকরা। উন্নত জাতের ভালো বীজ কাজে লাগিয়ে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে দেশে। কিন্তু সেখানেও রয়েছে সংকট। দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজ বীজের চাহিদা রয়েছে ১ হাজার ১০০ টন থেকে ১ হাজার ৩০০ টন পর্যন্ত। কিন্তু সরকারিভাবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) উৎপাদন করে পাঁচ-সাত টন। অন্যদিকে বেসরকারিভাবে প্রধানত কয়েকটি কোম্পানি ৫০-৫৫ টন বীজ উৎপাদন করে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সাবেক মহাপরিচালক ড. আবুল কালাম আযাদ বণিক বার্তাকে বলেন, পেঁয়াজ এখন রাজনৈতিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশেই উৎপাদনের মাধ্যমে স্বয়ম্ভরতার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে চালের মতো সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আশার বিষয় হলো দেশে গত কয়েক বছরে যে হারে উৎপাদন বেড়েছে, তাতে ১০-১২ লাখ টনের ঘাটতি খুব সহজে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পূরণ করা সম্ভব। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বীজ সরবরাহ বৃদ্ধি ও কৃষকের কাছে তা পৌঁছাতে হবে। দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এমন জাত আবাদ জনপ্রিয় করতে হবে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে আবাদযোগ্য বারি-৫, বারি-২ ও বারি-৩ জাতকে কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় করা যেতে পারে। শীতকালে আবাদ এলাকা বাড়াতে হলে তাহেরপুরী জাতের পাশাপাশি বারি-১ জাতটিরও সম্প্রসারণ করতে হবে। এছাড়া কৃষকের আর্থিক উদ্দীপনা হিসেবে ৪ শতাংশ সুদে যে ঋণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, সেটি প্রকৃত পেঁয়াজ চাষীদের কাছে পৌঁছাতে হবে। পাশাপাশি জাতীয়ভাবে চালের মতো পেঁয়াজের মজুদাগার নির্মাণ বা কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষণাগার তৈরিতে নজর বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে ইফপ্রির কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. আখতার আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, চাহিদা যে হারে বাড়ছে ঠিক সে হারে উৎপাদন না বাড়ার কারণেই আমদানি নির্ভরশীলতা থেকে বের হতে পারছে না বাংলাদেশ। পণ্যটির আমদানিতে ভারতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতার কারণে রফতানিকারক দেশটি দাম বাড়ানোয় সুযোগ নিচ্ছে। অন্যদিকে সরবরাহ সংকট দেখিয়ে দেশের মধ্যস্বত্বভোগীরা দাম বাড়ায়। ফলে একদিকে আমদানি পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিমুনাফার প্রবণতার কারণে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। দেশের বাজারে একটি নির্দিষ্ট সময়েই পেঁয়াজের দাম হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে উৎপাদনে জোর দেয়ার পাশাপাশি অবশ্যই আমদানির বাজার বহুমুখী করতে হবে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পণ্যটির মজুদ বাড়াতে হবে। বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অযৌক্তিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারের উদ্যোগ দৃশ্যমান করতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে কৃষকের উন্নত বীজ ও উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহ করতে হবে। আবার উৎপাদন মৌসুমে কৃষককে দামের সুরক্ষাও দিতে হবে। তবে আশার আলো দেখাচ্ছে নতুন এক গবেষণার তথ্য। এতে বলা হয়েছে, দেশে আবাদি জমি না বাড়িয়ে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে শীতকালে আখের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে আবাদ করা যেতে পারে পণ্যটি। আবার গ্রীষ্মকালে আদা, হলুদ ও মরিচের সঙ্গেও উৎপাদন করা সম্ভব। কৃষকের পণ্যের দামের নিশ্চয়তা দেয়ার পাশাপাশি মজুদ সক্ষমতা বাড়ানো গেলে পেঁয়াজের উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন কয়েক বছরের মধ্যেই সম্ভব। এ বিষয়ে ডিএই মহাপরিচালক ড. মো. আবদুল মুঈদ বলেন, সব ধরনের তথ্যগত বিষয়গুলো সমাধান করা হয়েছে। পোস্ট হারভেস্ট লস বাদ দিয়ে প্রকৃত বা শুকনো পেঁয়াজের উৎপাদনের তথ্য হিসাবে নেয়া হচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে স্থানীয় উন্নত জাত, বিশেষ করে তাহেরপুরী ও ফরিদপুরী জাত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন হাইব্রিড বীজ কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। কম জমিতে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে আমরা তত্পর। ফসল ওঠার মৌসুমে কৃষক যাতে দাম পায়, সে ব্যবস্থাও আমরা করছি। পাশাপাশি গত মৌসুম থেকে গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে ব্যাপক আকারে পেঁয়াজের উৎপাদনে জোর দেয়া হচ্ছে।
বোরো মৌসুমে প্রতি কেজি ধানের সরকার নির্ধারিত দাম ছিল ২৬ টাকা। সেই ধান কৃষকের কাছ থেকে চালকল মালিক ও ফড়িয়ারা কিনছেন ১৫ টাকারও কম দামে। প্রতি মণ ধান কিনতে তাদের ব্যয় হচ্ছে ৬০০ টাকারও কম। প্রতি মণ ধান থেকে তৈরি হয় ২৭ কেজি চাল, যা সরকারের কাছে হাজার টাকায় বিক্রি করছেন তারা। সে হিসেবে প্রতি মণ ধানে ৪০০ টাকা অর্থাৎ অস্বাভাবিক মুনাফা করছেন চালকল মালিক ও আড়তদাররা। ২০১৯ সালের বোরো মৌসুমে ধান-চালের দাম, উৎপাদন খরচ ও সংগ্রহ পদ্ধতির ওপর একটি গবেষণা করেছে আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইএফপিআরআই)। গবেষণায় দেখা গেছে, ওই মৌসুমে চালকল মালিকরা কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি ধান ১৪ টাকা ৯৭ পয়সা দামে কিনেছেন, যা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় ১১ টাকা কম। আবার সেই ধান প্রক্রিয়াজাত করে ন্যূনতম ৩৬ টাকায় বিক্রি করেছেন তারা। শুধু মিলার নয়, ট্রেডার্স বিশেষ করে ফড়িয়া, ব্যাপারী, আড়তদাররাও ধান সংগ্রহকালে কৃষকদের দামে ঠকিয়েছেন। কৃষকের কাছ থেকে তারা ধান কিনেছেন প্রতি কেজি ১৫ টাকা ২৬ পয়সায়। বাজারের প্রায় ৯২ শতাংশ ধান ট্রেডার্সরাই কিনে থাকেন। ফলে এ শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের কাছেই সবচেয়ে বেশি ঠকেছেন কৃষক। মিলার ও ট্রেডার্সদের অতিমুনাফার প্রবণতা থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে হলে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম সম্পূর্ণ সরকারিভাবে পরিচালিত করার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সরকার কৃষকের সব ধান কিনে নিলে গত বোরো মৌসুমে ধানের বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব হতো। এতে কৃষকরা আরো লাভবান হতে পারতেন। এমনকি ধানের দাম সরকার নির্ধারিত ২৬ টাকার নিচে হলেও প্রকৃত বাজারমূল্য উন্নত হতে পারত এতে। আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. আখতার আহমেদ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি ধান ১২-১৬ টাকায় কেনা মোটেও অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়। নগদ অর্থের প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে মৌসুমের শুরুতেই কম দামে ধান বিক্রি করেন কৃষক। আর এর সুযোগ নিচ্ছেন মিলার ও ফড়িয়ারা। মিলারদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বাজার থেকে সবচেয়ে কম দামে ধান কিনতে পারা, বিশেষ করে হাইব্রিড ধান। বাজারে এ ধানটির কোনো ক্রেতা থাকে না বলে মিলাররা অনেক ক্ষেত্রে ১২ টাকার নিচে ধানটি কিনতে পারেন। পরবর্তী সময়ে এ ধান প্রক্রিয়াজাত করে ৩৬ টাকায় সরকারের কাছে বিক্রি করেন তারা, যা থেকে তাদের অস্বাভাবিক মুনাফা হয়। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার কোনো বিকল্প নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ধান কেনায় আর্দ্রতা নিয়ে সমস্যা হতে পারে। সে প্রতিবন্ধকতা মেটাতে হলে আর্দ্রতা অনুসারে দাম নির্ধারণ করে কৃষকের কাছ থেকেই কিনতে হবে। আর্দ্র ধান শুকানোর কাজে চার্জের বিনিময়ে মিলারদের যুক্ত করতে হবে। সেটি করা গেলে কৃষকরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি মিলাররাও ব্যবসায় টিকে থাকতে পারবেন। সরকারের ক্রয়প্রক্রিয়ায়ও দক্ষতা আসবে এতে। মিলার ও ট্রেডার্সদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা। কেননা বোরো চাষে যুক্ত কৃষকের প্রায় ৪৭ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক। এসব কৃষকের জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৪৯ একর। অন্যান্য শ্রেণীর কৃষকের তুলনায় তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন গত বোরো মৌসুমে। এ শ্রেণীর কৃষকরা ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে তাদের মোট বোরো ধানের প্রায় অর্ধেক বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে এ সময়ে ধানের দাম কম থাকায় ন্যায্যমূল্য পাননি তারা। শুধু ক্ষুদ্র কৃষক নয়, দাদন নিয়ে ধান চাষ করেছেন এমন অন্য শ্রেণীর কৃষকরা দাম কম পেয়ে ক্ষতির শিকার হন। বোরো আবাদে যুক্ত কৃষকের ৩৩ শতাংশই বর্গাচাষী ও দাদন নিয়ে আবাদকারী কৃষক। জমির মালিকদের দ্রুত নগদ অর্থ পরিশোধের তাড়া থাকে তাদের। বর্গা বা ভাগচাষীর সংখ্যা মোট কৃষকের প্রায় ২৬ শতাংশ। এ শ্রেণীর কৃষককেও জমির ভাড়া বাবদ অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এজন্য তারাও কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। ক্ষুদ্র ও বর্গাচাষীদের লোকসান কমাতে সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহ বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হলেও সে কার্যক্রমে সরকারের অংশগ্রহণ খুবই কম। ২০১৯ সালের ক্রয় মৌসুমে সরকারের কাছে ধান বিক্রি করেছেন মাত্র ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ কৃষক। এ সময় মোট ধান সংগ্রহ করা হয়েছে ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬২ টন, যা ২০১৯ বোরো সংগ্রহ মৌসুমে মোট বোরো ধান উৎপাদনের মাত্র ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। মূলত মধ্যস্বত্বভোগীদের উত্থানের কারণেই ধানের দামে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। সেজন্য বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের পাশাপাশি মৌসুমের শুরুতে ধানের দাম নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়া সরকারের ধান সংগ্রহ বৃদ্ধি করতে হলে মজুদ সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি মৌসুমের শুরুতেই কৃষকরা যাতে ধান মজুদ বা সংরক্ষণ করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও করতে হবে। সে সঙ্গে বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা বিপণন অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করার ওপরও জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও চলতি মৌসুমের বোরো সংগ্রহ কার্যক্রম তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। প্রায় ২০ লাখ টনের বেশি সংগ্রহ লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় সময়সীমা আরো ১৫ দিন বাড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারের সংগ্রহ কার্যক্রমের মূল লক্ষ্যই হলো কৃষকের দাম নিশ্চিত করা এবং সরকারের খাদ্য মজুদ শক্তিশালী অবস্থানে রাখা। আর সরকারের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালিত হয় বোরো মৌসুমে। চলতি বোরো মৌসুমে বাজারে ভালো দাম পাওয়ার কারণে বাজারে তারা বিক্রি করছে। নিজেদের মজুদ রেখে কিছু অংশ সরকারের কাছে বিক্রি করছে। কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে যাতে মিলার ও ব্যবসায়ীদের কাছে ধান বিক্রি করতে পারেন, এজন্য সরকারি সংগ্রহ মূল্য মৌসুমের বেশ আগেই জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। এর সুফল এবারের মৌসুমে পাওয়া গেছে। আমরা কৃষকের সর্বোচ্চ ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে সব ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখব।
আশির দশকে শিক্ষাজীবন শেষ করে মত্স্য উৎপাদন ও বিপণনে যুক্ত হন ময়মনসিংহের তিন তরুণ। চাকরিতে না ঢুকে মত্স্য খামারের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান করতে গিয়ে শুরুতে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হলেও একপর্যায়ে সাফল্যের দেখা পান তারা। তাদের সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্থানীয় অনেক তরুণই এগিয়ে আসেন মত্স্য চাষের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানে। একপর্যায়ে এ চর্চা ছড়িয়ে পড়ে গোটা জেলায়, যার ধারাবাহিকতায় দেশে এখন মত্স্য উৎপাদনে শীর্ষ জেলা হয়ে উঠেছে ময়মনসিংহ। বর্তমানে বৈশ্বিক মত্স্য উৎপাদনে (অ্যাকুয়াকালচার) শীর্ষ পাঁচ দেশের অন্যতম বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে ময়মনসিংহ জেলার অবদান সবচেয়ে বেশি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জেলাটিতে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার টন। এর পরের অবস্থানে রয়েছে যশোর। জেলাটিতে এ সময় মাছ উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার টন। তৃতীয় শীর্ষ জেলা কুমিল্লায় এ সময় মোট মত্স্য উৎপাদনের পরিমাণ ২ লাখ ১৪ হাজার টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে মোট চাষকৃত মাছের উৎপাদন ছিল ৩৬ লাখ ২২ হাজার টন। এর মধ্যে এ তিন জেলায়ই উৎপাদন হয়েছে ৮ লাখ ৪৭ হাজার টন। সে হিসেবে দেশে চাষকৃত মাছের প্রায় ২৪ শতাংশই সরবরাহ হচ্ছে জেলা তিনটি থেকে। জানা গিয়েছে, ময়মনসিংহের তিন তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৮৩ সালে জেলার ত্রিশাল, ভালুকা ও মুক্তাগাছা এলাকায় মাছের চাষ শুরু করেন। নদী থেকে রেণু নিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে পোনা উৎপাদনের মাধ্যমেই মত্স্য খামার গড়ে তোলেন আল-ফালাহ মত্স্য খামারের পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন, ব্রহ্মপুত্র মত্স্য হ্যাচারির স্বত্বাধিকারী নুরুল হক ও রিলায়েন্স অ্যাকুয়া ফার্মের মালিক হূতিশ পণ্ডিত। তাদের দেখাদেখি শম্ভুগঞ্জ ও ফুলপুর, গৌরীপুর, ভালুকায়ও বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা স্বল্প পরিসরে মত্স্য চাষকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। একপর্যায়ে জেলার সব উপজেলায় লাখ লাখ তরুণ এভাবে মত্স্য খামারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। পাশাপাশি বড় কয়েকটি করপোরেট গ্রুপও এখন জেলাটিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বৃহৎ পরিসরে মাছের উৎপাদন শুরু করেছে। এছাড়া মত্স্য গবেষণাগত দিক থেকেও বড় দুটি প্রতিষ্ঠান জেলাটিতে মত্স্য উৎপাদনে বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত্স্য অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকরা তাদের গবেষণার প্রাথমিক ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন এ এলাকার বিভিন্ন উপজেলাকে। আঞ্চলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল দ্রুত রপ্ত করতে পারছেন স্থানীয় খামারিরা। ফলে এখানে মত্স্য চাষের সম্প্রসারণও হয়েছে অনেকটা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে। এ বিষয়ে মত্স্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ময়মনসিংহে মাছের উৎপাদন বাড়াতে তিন তরুণ এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মত্স্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তবে উৎপাদন ও বিপণনে এখনো বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সেগুলো দূর করতে হবে। এছাড়া মাছের খাদ্যের দাম কমিয়ে আনতে উদ্যোগ প্রয়োজন। মাছ চাষে প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের বিলটাও কমিয়ে আনতে হবে। কৃষির শস্য উপখাতের মতো সুযোগ-সুবিধা দেয়া গেলে মত্স্য উপখাতও প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে। এছাড়া মত্স্য খামারিদের জমির লিজের অর্থায়ন নিয়েও আরো কাজ করতে হবে। মত্স্য চাষে যশোর জেলার শুরুটা অবশ্য চল্লিশের দশকে। সে সময়ে প্রতাপাদিত্য নামে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি চাঁচড়ার বর্মণ পাড়া এলাকায় পাবদা মাছের চাষ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ষাটের দশকে মহসিন আলী মাস্টার নামের একজন উদ্যোক্তা পাবদা ছাড়াও অন্যান্য মাছ চাষের জন্য রেণু উৎপাদন শুরু করেন। তার দেখাদেখি পরবর্তী সময়ে এগিয়ে আসেন নতুন উদ্যোক্তারা। ফলে বর্তমানে দেশের প্রধান রেণু সরবরাহকারী অঞ্চলে পরিণত হয়েছে চাঁচড়া। যশোর উঠে এসেছে মত্স্য উৎপাদনে দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ জেলা হিসেবে। বর্তমানে যশোর জেলায় ২২ প্রজাতির মাছের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে রুই। উপজেলা পর্যায়ে মত্স্য খামার স্থাপনে এগিয়ে আসছেন বেসরকারি অনেক উদ্যোক্তা। জেলাটিতে মাছ উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে আফিল অ্যাকুয়া ফিশ। দুই হাজার বিঘা জমির ওপর মাছ চাষ করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিদিন মাছ ও মাছের পোনা উৎপাদন হচ্ছে ১০ টন। মত্স্য চাষের মাধ্যমে এখানে যেমন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি তা এখানকার জলাবদ্ধতার সমস্যা দূর করায়ও ভূমিকা রাখছে। এ বিষয়ে আফিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ আফিল উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ২০০৮ সালে শার্শা উপজেলার মান্দারতলা এলাকায় জলাবদ্ধতা নিয়ে ভাবতে শুরু করি। এরপর মত্স্য বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেই গড়ে তুলি অ্যাকুয়া ফিশ ফার্ম। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে আফিল অ্যাকুয়া ফিশে নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছ উৎপাদন করা হচ্ছে। যেখানে মাছের গুণগত মান সঠিক রাখা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন এলাকার মানুষ জলাবদ্ধতার কবল থেকে মুক্তি পেয়েছে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করা গিয়েছে। আমরা ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে মাছের উৎপাদনে যাব। বর্তমানে যশোরের উৎপাদিত মাছ প্রতিবেশী ভারতে রফতানি করা হচ্ছে বলে জানালেন বেনাপোল স্থলবন্দরের ফিশারিজ কোয়ারেন্টিন অফিসার মাহবুবুর রহমান। তিনি জানান, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এখান থেকে ভারতে মাছ রফতানি হয়েছে ৩২ লাখ ৬৭ হাজার ৪৪ কেজি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৬৩০ কেজিতে। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে এর পরিমাণ উন্নীত হয় ৫২ লাখ ৪৫ হাজার ৮ কেজিতে, যার রফতানি মূল্য ১ কোটি ৩১ লাখ ১২ হাজার ৫২০ ডলার। এ বিষয়ে যশোর জেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান জানান, যশোর জেলায় ৭০ হাজার ২৯২ হেক্টর জমিতে মাছের উৎপাদন হচ্ছে। জেলাটি বর্তমানে দেশে মত্স্য উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। বছরে এখানে উৎপাদিত মাছ বেচাকেনা হচ্ছে প্রায় হাজার কোটি টাকার। এখানকার মাছ রফতানির পাশাপাশি সারা দেশেই বিক্রি হচ্ছে। জেলায় মাছ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িতদের জন্য আমরা সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সুবিধার সম্প্রসারণ করছি। বাজারজাত ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন এবং উন্নত জাতের পোনা সরবরাহ করা গেলে দেশের খামারগুলোয় মাছের উৎপাদন বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় গুণগত ও মানসম্পন্ন ব্রুড মাছ আমদানি করে বেসরকারি খাতে সরবরাহ করলে মাছের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া ফিশ ফিডের দামও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। উৎপাদন টেকসই করতে হলে পরিবেশগত ভারসাম্য আনাটাও জরুরি। এছাড়া মাছ উৎপাদন শিল্পে মূল্য সংযোজন কীভাবে বাড়ানো যায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।